জলাবদ্ধ ভবদহে দেখা দিচ্ছে পানিবাহিত রোগ, বিশুদ্ধ পানির সংকট
নিজস্ব প্রতিবেদক।
যশোরের অভয়নগর, মণিরামপুর, কেশবপুর এবং খুলনার ডুমুরিয়া ও ফুলতলা উপজেলার অংশবিশেষ নিয়ে ভবদহ অঞ্চল। পলি জমে মুক্তেশ্বরী, টেকা, শ্রী ও হরি নদী নাব্য হারিয়েছে। এতে এ অঞ্চলে স্থায়ী জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। আগস্টে টানা বৃষ্টিতে প্লাবিত হয় এ অঞ্চল। তিন মাসের বেশি সময় ধরে পানিবন্দি রয়েছে চার লক্ষাধিক মানুষ। স্থায়ী জলাবদ্ধতার কারণে দেখা দিয়েছে পানিবাহিত রোগ। নলকূপগুলো নিমজ্জিত থাকায় বিশুদ্ধ পানির সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। স্মৃতি ধরের বাড়ি মণিরামপুর উপজেলার ডাঙা মশিয়াহাটি গ্রামে। তার বাড়ির উঠানে এখনো কোমরসমান পানি। রান্নাঘর, শোয়ার ঘর, গোয়াল ও নলকূপ তলিয়ে রয়েছে। পানি কালো বর্ণ ধারণ করেছে। উঠানে ভাসছে ডিঙি নৌকা। বাড়ির বারান্দা থেকে টয়লেট, কিংবা রাস্তায় উঠতে একমাত্র ভরসা এ নৌকা। পোকামাড়কের সঙ্গে দোচালা পাকা টিনের এ বাড়িতেই চার সদস্যের পরিবারের দুর্বিষহ জীবনযাপন।
টানা তিন মাস ধরে পানিবন্দি স্মৃতি ধর বলেন, ‘খাওয়ার কষ্ট, রান্নার কষ্ট, থাকার কষ্ট। এখন শীতকাল; এ সময়েও পানির মধ্যে আছি। কবে বর্ষাকাল শেষ হয়েছে; এখনো বাড়িঘরে হাঁটুসমান পানি। আমাদের দুঃখ কি কোনোদিন শেষ হবে না।’যশোরের অভয়নগর উপজেলার ভবানীপুর গ্রামের ভবদহ এলাকায় ১৯৬১ সালে নির্মাণ করা হয় স্লুইসগেট। এর পরই মণিরামপুর, কেশবপুর, অভয়নগর এবং খুলনার ফুলতলা ও ডুমুরিয়া উপজেলার মধ্যবর্তী ভবদহের কৃষকরা জলাবদ্ধতার কবলে পড়েন। ১৯৮৮ সাল থেকে স্থায়ীভাবে দেখা দেয় জলাবদ্ধতা। এর মূল কারণ ভবদহের ভাটিতে থাকা নদীগুলোর নাব্য হারানো। এ অঞ্চলের জলাবদ্ধতা নিরসনে কয়েক দশকে সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। ১৯৯০ থেকে চলতি বছর পর্যন্ত ভবদহ ঘিরে নেয়া ২১টি প্রকল্পে ব্যয় দেখানো হয়েছে প্রায় ৬০০ কোটি টাকা। তার পরও নিরসন হয়নি জলাবদ্ধতা। উল্টো উজান থেকে নেমে আসা পানি গ্রাম ও বিলে প্রবেশ করছে। এতে দিন দিন পরিস্থিতি আরো নাজুক হয়ে পড়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য বলছে, চার দশকে জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে সরকার। অভিযোগ রয়েছে, এসব অর্থের বেশির ভাগই লুটপাট হয়েছে। দুনীর্তির সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের বিচার দাবি ও জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধানে টাইডাল রিভার ম্যানেজমেন্ট (টিআরএম) চালু এবং আমডাঙ্গা খাল সংস্কারের দাবি জানিয়েছে ভবদহের বাসিন্দারা।
সরজমিনে দেখা গেছে, ‘রাস্তার ওপর টং ঘর বানিয়ে গবাদিপশুর সঙ্গে থাকছে সেখানকার বাসিন্দারা। টিউবওয়েল তলিয়ে যাওয়ায় দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ পানির সংকট। তিন মাসের জলাবদ্ধতার কারণে ফুরিয়ে এসেছে গোখাদ্য। ভারি বৃষ্টিতে অভয়নগর উপজেলার চার ইউনিয়নে বাড়িঘরে পানি উঠে যায়। উপজেলার চলিশিয়া, পায়রা, দিঘলিয়া, কোটা, প্রেমবাগ, ডুমুরতলা, আন্ধা, বেদভিটা, সুন্দলী, ডহর মশিয়াহাটিসহ কয়েকটি গ্রামের অধিকাংশ বাড়িতে এখনো পানি রয়েছে। সচ্ছল পরিবারগুলো যাতায়াতের জন্য বাড়ির উঠানে বাঁশের সাঁকো তৈরির পাশাপাশি চলাচলে ব্যবহার করছে ডিঙি নৌকা। তবে দরিদ্র পরিবারগুলোকে থাকতে হচ্ছে গৃহপালিত পশুর সঙ্গে। সড়কজুড়ে ঝুপড়ির এক পাশে থাকছে গরু-ছাগল, অন্যপাশে চৌকি বানিয়ে রাতযাপন করছে তারা। সেখানেই চলছে তাদের খাওয়াদাওয়া। দীর্ঘ জলাবদ্ধতার কারণে পানিবাহিত বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে অনেকে।
বেদভিটা গ্রামের সাবেক ইউপি সদস্য প্রফুল্ল কুমার বলেন, ‘একদিন ভাত না খেয়ে বেঁচে থাকা যায়, কিন্তু পানি না খেয়ে থাকা যায় না। আমরা কীভাবে বাঁচব? এলাকায় বিশুদ্ধ পানি নেই। তিন-চার কিলোমিটার দূর থেকে পানি আনতে হয়। সেই পানি আনতেও লাগে নৌকা বা ভেলা।’
বর্ষা বিদায় নিয়ে শীতের আগমন ঘটলেও ভবদহ এলাকা এখনো জলাবদ্ধ। প্রায় সাড়ে তিন যুগ ধরে জলাবদ্ধতায় দুর্ভোগ পোহাচ্ছে তারা। তবে এবারের জলাবদ্ধতা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।
হাটগাছা গ্রামের অনামিকা বিশ্বাস বলেন, ‘ঘরের চারপাশে পানি। তবে খাওয়ার উপযোগী পানি নেই একটুও। গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি ঘরেই থাকে।’
পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য বলছে, চার দশকে ভবদহ অঞ্চলের জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রায় ৬০০ কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে। কিন্তু জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান হয়নি। পানি সংগ্রাম কমিটির নেতাদের দাবি, চার দশকে জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে সরকার, যার সিংহভাগ লুটপাট হয়েছে। সাবেক প্রতিমন্ত্রী স্বপন ভট্টচার্য্য ও তার ছেলে শুভ ভট্টচার্য্যের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ভবদহ প্রকল্পে কাজের নামে লুটপাট করেছে।
এ ব্যাপারে পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক হামিদ গাজী বলেন, ‘টিআরএম প্রকল্প বাদ দিয়ে ২০২২ সাল থেকে পানি উন্নয়ন বোর্ড যে সেচ প্রকল্প গ্রহণ করেছিল, সেটাই এখন ভোগান্তির কারণ।’
ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির আহ্বায়ক রণজিৎ বাওয়ালী বলেন, ‘গত ৪০ বছরে ভবদহ এলাকা সংস্কারের নামে শত শত কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। প্রকল্পে বরাদ্দের টাকা পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়, পানি উন্নয়ন বোর্ড, ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের নেতা ও ঠিকাদার লুটপাট করেছে। ফলে হাজার কোটি টাকার প্রকল্পেও সুফল মেলেনি। ১০ নভেম্বর ভবদহ এলাকার বিভিন্ন স্থান পরিদর্শন করেছেন পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন দ্রুত স্থায়ী সমাধানের। তবে আর আশ্বাস কিংবা ত্রাণ নয়; দ্রুত জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান দেখতে চায় ভবদহ পাড়ের বাসিন্দারা।
সূত্র – বণিক বার্তা