আন্তর্জাতিক।। আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলী হোসেইনি খামেনি (Ayatollah Seyyed Ali Hosseini Khamenei) ছিলেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা (Supreme Leader) এবং আধুনিক মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম প্রভাবশালী ও বিতর্কিত রাজনৈতিক-ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব। তিনি ১৯ এপ্রিল ১৯৩৯ সালে ইরানের পবিত্র নগরী মাশহাদে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৮১ থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত তিনি ইরানের তৃতীয় রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এরপর ৪ জুন ১৯৮৯ সালে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত হন এবং টানা প্রায় ৩৬ বছর সেই পদে থেকে দেশের রাজনৈতিক, সামরিক ও ধর্মীয় নেতৃত্ব দেন।
দীর্ঘ নেতৃত্বের সময় তিনি ইরানের পররাষ্ট্রনীতি, প্রতিরক্ষা কৌশল, পারমাণবিক কর্মসূচি এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রাখেন। সমর্থকদের কাছে তিনি ছিলেন ইসলামী বিপ্লবের আদর্শ রক্ষাকারী ও দৃঢ়চেতা নেতা। অন্যদিকে সমালোচকদের কাছে তিনি ছিলেন কঠোর শাসনব্যবস্থা, রাজনৈতিক দমননীতি এবং মানবাধিকার ইস্যুতে বিতর্কিত এক শাসক। ফলে ইতিহাসে তিনি একই সঙ্গে প্রভাবশালী, আলোচিত এবং বিতর্কিত নেতা হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।
২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সালে ৮৬ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়। ইরানের রাষ্ট্রীয় ঘোষণা অনুযায়ী তাঁর শেষকৃত্যের আনুষ্ঠানিকতা ৪ জুলাই থেকে শুরু হয়ে ৯ জুলাই মাশহাদে দাফনের মাধ্যমে সম্পন্ন হওয়ার কথা।
আজ তেহরানের আকাশে যেন নেমে এসেছে এক অদ্ভুত নীরবতা। ফুলে ঢাকা একটি কফিনকে ঘিরে মানুষের ঢল, শোকের ভারে নুয়ে পড়া পরিবেশ, আর সময়ের নির্মম বাস্তবতা যেন একসঙ্গে ধরা দিয়েছে। যিনি দীর্ঘ ছত্রিশ বছর একটি রাষ্ট্রের ক্ষমতার কেন্দ্রে ছিলেন, আজ তিনি নিস্তব্ধ। ইতিহাস বারবার প্রমাণ করে, সময়ের কাছে সবচেয়ে শক্তিশালী মানুষও একদিন সাধারণ মানুষের মতোই মাটির বুকে ফিরে যায়।
শেষ মুহূর্তটি এসেছিল গভীর রাতের অন্ধকারে। নিরাপত্তার সর্বোচ্চ ব্যবস্থা, মাটির গভীরে নির্মিত শক্তিশালী আশ্রয় এবং অজেয় বলে মনে হওয়া প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, সবকিছুই শেষ পর্যন্ত ভাগ্যের সামনে অসহায় হয়ে পড়ে। বহু পরিকল্পনায় পরিচালিত এক অভিযানের পর মুহূর্তেই বদলে যায় বহু বছরের ক্ষমতার গল্প। যে মানুষটি একসময় গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক সিদ্ধান্তে প্রভাব রাখতেন, তিনিও শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর চিরন্তন সত্য এড়াতে পারেননি।
সমর্থকদের কাছে তিনি ছিলেন দৃঢ়চেতা ও আপসহীন নেতৃত্বের প্রতীক। আন্তর্জাতিক চাপ, নিষেধাজ্ঞা কিংবা যুদ্ধের হুমকি, কোনো কিছুই তাঁকে নিজের অবস্থান থেকে সরাতে পারেনি। শেষ সময়েও আত্মসমর্পণ কিংবা নির্বাসনের পরিবর্তে তিনি নিজের বিশ্বাসের পথেই অটল ছিলেন। ইতিহাস তাঁর ভূমিকা নিয়ে বিভিন্ন মত প্রকাশ করবে, কিন্তু তাঁর দৃঢ়তা নিয়ে বিতর্ক খুব কমই থাকবে।
জীবনের শেষ সময়ে তিনি অনেকটাই আড়ালে চলে গিয়েছিলেন। ক্ষমতার সর্বোচ্চ অবস্থানে থেকেও শেষ দিনগুলো কেটেছে সীমিত পরিসরে। এ যেন ক্ষমতার সবচেয়ে বড় শিক্ষা, শিখরে পৌঁছানো যত কঠিন, সেখানে চিরদিন থাকা তার চেয়েও অসম্ভব।
তাঁর মৃত্যুর সংবাদে মানুষের প্রতিক্রিয়াও ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। কোথাও শোক, অশ্রু আর স্মৃতিচারণ, আবার কোথাও দীর্ঘদিনের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। কারও কাছে তিনি ছিলেন একজন অভিভাবক, আবার কারও কাছে ছিলেন কঠিন সময়ের প্রতীক। ইতিহাসের অনেক চরিত্রের মতো তিনিও থেকে গেলেন ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির আলোচনায়।
তবে এই ঘটনার সবচেয়ে বেদনাদায়ক দিক অন্যত্র। সংঘাতের প্রতিটি অধ্যায়ে যেমন হয়, এবারও প্রাণ হারিয়েছেন অসংখ্য নিরীহ মানুষ। শিশু, নারী, বৃদ্ধ, সাধারণ পরিবার, যাদের কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ছিল না, তারাই সবচেয়ে বড় মূল্য দিয়েছেন। যুদ্ধের ময়দানে বিজয় বা পরাজয়ের হিসাব লেখা হয় ক্ষমতাবানদের নামে, কিন্তু রক্তের দাগ লেগে থাকে সাধারণ মানুষের জীবনে।
আজ শুরু হয়েছে তাঁর শেষ বিদায়ের যাত্রা। আনুষ্ঠানিকতা শেষে তিনি ফিরে যাবেন সেই মাটিতেই, যেখান থেকে একদিন তাঁর জীবনের পথচলা শুরু হয়েছিল। জীবন যেন শেষ পর্যন্ত নিজ জন্মভূমির কাছেই ফিরে আসে।
“প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদন করতে হবে।”
(সূরা আলে ইমরান, আয়াত ১৮৫)
ক্ষমতা, প্রতিপত্তি, নিরাপত্তা, সম্পদ কিংবা প্রভাব, কোনোটিই মৃত্যুর অবধারিত সত্যকে থামাতে পারে না। শাসক কিংবা শাসিত, ধনী কিংবা দরিদ্র, শেষ গন্তব্য সবার জন্য একই।
একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটেছে, কিন্তু ইতিহাসের পথচলা থেমে থাকে না। প্রতিটি সমাপ্তি নতুন প্রশ্নের জন্ম দেয়, নতুন বাস্তবতার সূচনা করে। ভবিষ্যৎ কোন পথে এগোবে, শান্তির দিকে, নাকি আরও অস্থিরতার দিকে, তার উত্তর দেবে সময়ই।
Disclaimer: এই লেখাটি চলমান আন্তর্জাতিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে একটি প্রতিফলনমূলক বিশ্লেষণ। এর উদ্দেশ্য কোনো ব্যক্তি, রাষ্ট্র বা পক্ষকে সমর্থন বা বিরোধিতা করা নয়; বরং সংঘাতের মানবিক দিক এবং সকল নিরীহ প্রাণহানির প্রতি গভীর শোক প্রকাশ করা।
লেখক ও সংবাদকর্মী
✍️ আর জে রবিউল ইসলাম ফরাজি
সকাল ০৬:১০ | ৪ জুলাই ২০২৬