স্টাফ রিপোর্টার,:-বাংলাদেশ রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনী (আরএনবি)-তে ইন্সপেক্টর পদে পদোন্নতি ঘিরে দীর্ঘদিনের জটিলতা নতুন করে সামনে এসেছে। প্রায় এক দশক ধরে চলমান এই সমস্যার মধ্যে মেধাভিত্তিক পরীক্ষা ও জ্যেষ্ঠতাভিত্তিক পদোন্নতি- দুই পদ্ধতির দ্বন্দ্ব এখন তীব্র আকার ধারণ করেছে।
এতে একদিকে পদোন্নতি প্রক্রিয়া স্থবির হয়ে পড়ার পাশাপাশি ক্ষোভ বাড়ছে পদোন্নতি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ইন্সপেক্টরদের মধ্যে।
২০১৭ সালের ১৯ ডিসেম্বর আরএনবি পূর্বাঞ্চলে সাব-ইন্সপেক্টর থেকে ইন্সপেক্টর পদে পদোন্নতির জন্য বিভাগীয় পদোন্নতি কমিটি গঠন করা হয়। চীফ কমান্ড্যান্ট (পূর্ব) এর কার্যালয় থেকে জারি করা ওই আদেশে জানানো হয়, নিয়োগ বিধি-১৯৮৫ (সংশোধিত ১৯৯৭) অনুযায়ী যোগ্যতা যাচাইয়ের জন্য কমিটিকে ৩০ দিনের মধ্যে লিখিত, ব্যবহারিক ও মৌখিক পরীক্ষা নিয়ে মেধাক্রম নির্ধারণ করে সুপারিশ দাখিল করতে বলা হয়েছে।
একই বছরে প্রকাশিত আরেক বিজ্ঞপ্তিতে ইন্সপেক্টর পদে সম্ভাব্য ছয়টি শূন্য পদ পূরণে বিভাগীয় নির্বাচনী পরীক্ষার জন্য আবেদন আহ্বান করা হয়। যোগ্য প্রার্থীদের লিখিত (৭০ নম্বর), ড্রিল (৩০ নম্বর) ও মৌখিক (৫০ নম্বর) পরীক্ষার মাধ্যমে বাছাইয়ের কথা বলা হয়। লিখিত পরীক্ষায় পেশাগত ও সাধারণ জ্ঞান, আইন, বিধিমালা এবং প্রশাসনিক বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল।
এর পরপরই পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হলেও তার আরো সাত বছর পর ২০২৪ সালের ১৪ অক্টোবর নন-ক্যাডার কর্মকর্তা ও কর্মচারী (জ্যেষ্ঠতা ও পদোন্নতি) বিধিমালা, ২০১১ এর অনুচ্ছেদ-৭(১) অনুযায়ী রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীতে কর্মরত ইন্সপেক্টরগণের পারস্পারিক জ্যেষ্ঠতার একটি মেধাভিত্তিক খসড়া তালিকা প্রকাশ করা হয়।
তবে ওই খসড়া তালিকাকে বাতিল করে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ জ্যেষ্ঠতাভিত্তিক আরেকটি তালিকা প্রকাশ করে। আর এতেই যেন বাধে বড় বিপত্তি।
দীর্ঘদিন ধরে পরীক্ষাভিত্তিক পদোন্নতির এই ধারার মধ্যে হঠাৎ জ্যেষ্ঠতাকে প্রাধান্য দেওয়ায় শুরু হয় বিতর্ক।
রেল সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন, পুলিশ, সেনাবাহিনী কিংবা দুর্নীতি দমন কমিশনসহ অন্যান্য সংস্থায় যেখানে পদোন্নতি মেধার ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়, সেখানে রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনী (আরএনবি)- কেনো ভিন্ন পথে হাঁটার চেষ্টা করছে।
রেল সূত্রে জানা যায়, আরএনবির কর্মকর্তাদের দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে অপরাধ তদন্ত, চার্জশিট প্রণয়ন এবং আদালতে মামলা পরিচালনা- যেখানে দক্ষতা ও জ্ঞানের মূল্যায়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে অতীতে সব পদোন্নতি লিখিত, ড্রিল ও মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে হয়ে আসছিল।
এদিকে এই জ্যেষ্ঠতাভিত্তিক পদোন্নতির উদ্যোগ নেওয়ায় বঞ্চিত হতে পারেন মেধাবীরা এবং ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বাহিনীর পেশাগত দক্ষতা।এমনকি বিষয়টি আইনি জটিলতায় গড়াতে পারে বলেও ধারণা করছে আরএনবি সংশ্লিষ্টরা।
অভিযোগ উঠেছে, বিদ্যমান নিয়োগ বিধিমালা অনুসরণ না করে তালিকা প্রণয়ন করায় এতে বৈষম্য সৃষ্টি হয়েছে।
প্রকাশিত জ্যেষ্ঠতাভিত্তিক তালিকার বিরুদ্ধে আপত্তি জানিয়ে আরএনবি সংশ্লিষ্টরা বলেন, পারস্পরিক জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণে “রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনী রিক্রুটমেন্ট রুলস-১৯৮৫ (সংশোধিত ১৯৯৭)” উপেক্ষা করা হয়েছে।
তাদের দাবি, ২০১৮ সালে বিভাগীয় পরীক্ষার মাধ্যমে যারা পদোন্নতি পেয়েছেন, তাদের মেধাক্রম অনুযায়ী জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু নতুন তালিকায় পরে পদোন্নতি পাওয়া কর্মকর্তাদের আগে স্থান দেওয়ায় তা অযৌক্তিক এবং বিধিবহির্ভূত।
এছাড়া নন-ক্যাডার কর্মকর্তা/কর্মচারী (জ্যেষ্ঠতা ও পদোন্নতি) বিধিমালা-২০১১ আংশিকভাবে প্রয়োগ করে তালিকা তৈরির অভিযোগও উঠেছে।
রেল সংশ্লিষ্টদের মতে, একটি ধারা বিবেচনায় নিয়ে অন্য ধারা উপেক্ষা করায় বিভ্রান্তি ও বৈষম্য তৈরি হয়েছে।
আরেক দিকে, দীর্ঘ প্রায় আট বছরে বিসিএসের মাধ্যমে ‘সহকারী কমান্ড্যান্ট’ পদে সরাসরি নিয়োগের জন্য কোনো চাহিদাপত্র না পাঠানোর বিষয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
অভিযোগ রয়েছে, একটি প্রভাবশালী চক্র পদোন্নতির মাধ্যমে নিজেদের পছন্দের লোকদের উচ্চপদে বসানোর চেষ্টা করছে এবং এতে অনিয়ম ও অর্থ লেনদেনের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
এ বিষয়ে রেল বিশ্লেষক মোহাম্মদ হোসেন বলেন, রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীতে সদস্য, কর্মকর্তা ও সুপিরিয়র অফিসার- এই তিন স্তরে পৃথকভাবে ‘জ্যেষ্ঠতা তালিকা’ প্রণয়ন হওয়া উচিত। কিন্তু বর্তমান কমিটি সঠিক পদ্ধতি অনুসরণ না করে বিভ্রান্তিকর তালিকা তৈরি করেছে, যা তাদের দক্ষতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতে শুধুমাত্র জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে নয়, পরীক্ষা ও মেধার ভিত্তিতেই পদোন্নতি দেওয়া উচিত।
তার মতে, বর্তমান কমিটির দক্ষতা, যোগ্যতা ও নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ায় দাখিলকৃত প্রমাণ বিবেচনায় নিয়ে ডিডিই-৩ এর নেতৃত্বে, কমিটির বাইরে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে নতুন একটি কমিটি গঠন করে গ্রহণযোগ্য জ্যেষ্ঠতা তালিকা প্রণয়ন করা যেতে পারে।
তিনি আরও বলেন, মামলা রুজু, তদন্ত ও আদালতে পরিচালনার মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনে দক্ষ কর্মকর্তাদের পদোন্নতি দিতে ‘পদোন্নতি পরীক্ষা’ নিশ্চিত করা জরুরি। তবে রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর নিয়োগ ও পদোন্নতি বিধিমালা-২০২৬ গেজেটভুক্ত হওয়ার পর তা বাস্তবায়নই হবে যথাযথ, এর আগে তড়িঘড়ি পদোন্নতি অনৈতিক সুবিধা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
এছাড়াও আরএনবি সংশ্লিষ্টদের প্রস্তাব, জ্যেষ্ঠতা পুরোপুরি বাদ না দিয়ে পরীক্ষার ফলাফলের সঙ্গে সমন্বয় করে পদোন্নতির ব্যবস্থা করা যেতে পারে, যেমনটি পুলিশে অনুসরণ করা হয়। এতে একদিকে অভিজ্ঞতার মূল্যায়ন হবে, অন্যদিকে মেধারও যথাযথ স্বীকৃতি মিলবে।
আরএনবি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দ্রুত সমাধান না হলে এই জটিলতা ভবিষ্যতে বাহিনীর কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
এদিকে রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর চীফ কমান্ড্যান্ট (পূর্ব) মো. জহিরুল ইসলাম একই বিষয়ে জোর দিয়ে বলেন, এটি একটি বাহিনী- বাহিনীতে কখনোই জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে পদোন্নতি দেওয়া হয় না, পদোন্নতি হয় পরীক্ষার মাধ্যমে মেধাভিত্তিক যোগ্যতা যাচাই করে।
পরীক্ষার পর এতো বছরেও কেন পদোন্নতির মূল তালিকা প্রকাশ হয়নি- এ ব