স্টাফ রিপোর্টার: ২০০২ সালে ১০ নভেম্বর মডেল তিন্নির মৃতদেহ পোস্তগোলার বুড়িগঙ্গা ব্রিজের নিচের ১১ নম্বর পিলার বেদির উপর পাওয়ার পরের দিন ১১ নভেম্বর কেরানীগঞ্জ থানা পুলিশ একটি আত্মহত্যাজনিত অপমৃত্যুর মামলা রুজু করে। মামলাটি সিআইডিতে যাওয়ার পরে তদন্ত কর্মকর্তা হিসাবে এএসপি আব্দুর রশিদ দায়িত্ব পান। তদন্তের সুপারভাইজ করতেন সিআইডির তৎকালীন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ফজলুল করিম। ঐ বছরের ১৩ ডিসেম্বর তিনি সংবাদ সম্মেলন করে জানান – তথ্য-প্রমান ও পোস্টমর্টেম রিপোর্টের উপর ভিত্তি করে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে মডেল তিন্নি প্রকৃতপক্ষে আত্মহত্যা করেছেন। কিন্তু এই সংবাদ সম্মেলনের পরপরই ফজলুল করিমকে এই মামলার সুপারভিশনের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয়া হয়। রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী একটি মহল থেকে তদন্ত কর্মকর্তা আব্দুর রশিদকে নির্দেশ দেয়া হয় এই মামলায় যে কোনোভাবেই হোক হত্যার চার্জশিট দিতে হবে।
জানা যায়, মডেল তিন্নির ফুপু নার্গিস তাহের, গৃহকর্মী বিনা, ও শেফালিকে ভয় ও প্রলোভনের মাধ্যমে আত্মহত্যার পরিবর্তে হত্যার স্বপক্ষে স্বাক্ষ্য দেয়ার জন্য সিআইডি অফিসে ডেকে নেয়া হয়। তারা রাজি না হলে গৃহকর্মীদেরকে এই মামলার আসামী বানিয়ে জেলে পাঠানো হয়। কয়েক বছরের মধ্যে ৭ জন তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন করা হয়। অবশেষে বানানো গল্পে তৈরী হয় এই মামলার চার্জশিট। ২০০৮ সালের ৮ নভেম্বর সিআইডির এএসপি মোজাম্মেল হক এই মামলায় গোলাম ফারুক অভিকে আসামি করে আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন।
২০১০ সালের ১৪ জুলাই ঢাকার ৭ম অতিরিক্ত জেলা আদালতে অনুপস্থিত অভির বিরুদ্ধে মামলার বিচার শুরু হয়। সরকারের নিয়োগকৃত স্টেট ডিফেন্স অ্যাডভোকেট ইলিয়াস চার্জ গঠনের দিনই আদালতকে জানান এই মামলায় হত্যার চার্জশিট হতে পারেনা যেহেতু হত্যাকাণ্ডের স্বপক্ষে একজন স্বাক্ষীও পাওয়া যায়নি। ২০১৬ সালের ৩১ অগাস্ট মামলাটি রায়ের জন্য নির্ধারিত থাকা স্বত্তেও রায় হয়নি। নির্ধারিত রায়ের তারিখ ৪১ বার পরিবর্তনের পরে ১৫ নভেম্বর ২০২১ সালে আদালতের জজ কেশব রায় চৌধুরী স্বাক্ষীদের পুনঃ স্বাক্ষ্য নেয়ার সিদ্ধান্ত জানান। ২০২২ সালে মামলাটির স্বাক্ষ্য পর্ব আবার নতুন করে শুরু হয়। তিন্নির বাসার দুজন গৃহকর্মী এবং মামলা সংশ্লিষ্ট অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্বাক্ষীরা সহ ময়নাতদন্তকারী ডাক্তার জোবাইদুর রহমান দ্বিতীয়বারের মতো আদালতে স্বাক্ষ্য প্রদান করেন। তদন্ত কর্মকর্তা অবসরপ্রাপ্ত এএসপি মোজাম্মেল হক আদালতে তার স্বাক্ষ্যে জানান যে, ৬ বছর তদন্ত করেও হত্যার স্বপক্ষে কোনো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ স্বাক্ষী পাওয়া যায়নি। তা স্বত্তেও রাজনৈতিক ও উর্ধতন মহলের চাপে এই মামলায় গোলাম ফারুক অভিকে আসামি করে চার্জশিট দিতে হয়েছে।
২০২৫ সালের ১৪ জানুয়ারী তারিখে ঢাকার দ্বিতীয় অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ শাহীনুর আক্তার গোলাম ফারুক অভিকে তার অনুপস্থিতিতে এই মামলা থেকে বেকসুর খালাস দেন। রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলেন যে, মডেল তিন্নির অস্বাভাবিক মৃত্যু প্রকৃতপক্ষে আত্মহত্যা এবং এই মৃত্যুর সাথে অভির কোনো সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়নি। তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রনোদিত।
দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় ক্যানাডায় রাজনৈতিক আশ্রয়ে থেকে গত বছরের নভেম্বরে অভির দেশে আসার কথা ছিল। কিন্তু তাকে দেশে ফিরতে ট্রাভেল পারমিট দেয়া হয়নি। অথচ যে কোনো আবেদনকারীকে ২৪ থেকে ৪৮ ঘন্টার মধ্যে এই পারমিট ইস্যু করার নিয়ম। তার নির্বাচনী এলাকা বরিশাল-২ এর জনগণের ধারণা তিনি যাতে আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে না পারেন সেজন্যই তাকে এই পারমিট দেয়া হয়নি। ৭ম সংসদের সর্বকনিষ্ঠ সদস্য অভি তার মেয়াদকালীন সময়ে দেশি বিদেশী প্রকল্পের মাধ্যমে এলাকায় ব্যাপক উন্নয়ন করে দেশব্যাপী আলোচিত হয়েছিলেন। জনপ্রিয় এই সাবেক সংসদ সদস্যকে রাজনীতি ও সংসদ নির্বাচন থেকে দূরে রাখতেই একটি মহলের বিভিন্ন ষড়যন্ত্রমূলক অপতৎপরতা এখনো অব্যাহত রয়েছে বলে তার সমর্থকরা মনে করেন।