স্টাফ রিপোর্টার:সিলেটের সুবহানীঘাটস্থ আল হারামাইন হাসপাতালে চিকিৎসায় অবহেলা ও ভুল সিদ্ধান্তের কারণে মাত্র এক দিনের ব্যবধানে মৃত্যুবরণ করেন ৬৯ বছরের বেদার আহমদ। পরিবারের অভিযোগ—চিকিৎসকের ভুল ডোজ, নার্সের উদাসীনতা, পর্যবেক্ষণের অভাব এবং তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা না নেওয়ায় তার মৃত্যু দ্রুত ঘটে। বিষয়টি এখন উঠে এসেছে চিকিৎসা ব্যবস্থার ভয়াবহ দুর্বলতার প্রতীক হিসেবে।
মৃত ব্যক্তির মেয়ে ডা. নুরিয়া জাহান কেয়া, পেশায় একজন চিকিৎসক। কিন্তু বাবার মৃত্যুর ঘটনায় তিনি আজ একজন ভেঙে পড়া কন্যা।
বাবা তো সুস্থ হয়ে ফিরছিলেন… তাঁকে এমন মৃত্যু কে দিল?”—বুকভাঙা কান্নায় বলেন তিনি।
ঘটনার শুরু: সামান্য বমি–কাশি থেকে হাসপাতালের মৃত্যুশয্যা
১২ নভেম্বর বেদার আহমদকে সামান্য বমি ও কাশি দেখা দিলে আল হারামাইন হাসপাতালে ভর্তি করা হয় ডা. রাহাত আমিন চৌধুরীর অধীনে। এর আগে নর্থ ইস্ট ও মাউন্ট এডোরা হাসপাতালে চিকিৎসা শেষে তিনি পুরোপুরি স্থিতিশীল ছিলেন। ভর্তি হওয়ার সময় তার vitals ছিল স্বাভাবিক, খাবার খাওয়ার অবস্থাও ভালো। রোগী সম্পূর্ণ সচেতন ছিলেন, কেবল প্রবল ভার্টিগো ছিল।
কিন্তু হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর শুরু হয় একের পর এক ভুল—অভিযোগ–চিকিৎসাগত অবহেলার ক্রমবর্ধমান তালিকা
১. স্বাভাবিক সুগারেও ভুল ইনসুলিন ডোজ
১৩ নভেম্বর সকালে তার FBS ছিল ৭.১ mmol/L—যা স্বাভাবিক।
ডা. কেয়া অস্ট্রেলিয়া থেকে জানিয়ে দেন যেন ইনসুলিন না দেওয়া হয়।
তারপরও নার্স কাউকে না জানিয়ে ১৬ ইউনিট ইনসুলিন দিয়ে দেন, বলেন—এটা নিয়ম।
পরে দেখা যায় হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার আগের দিনও তাকে অপ্রয়োজনীয় ইনসুলিন দেওয়া হয়েছিল।
২. RBS বিপজ্জনকভাবে ৩.১ mmol/L – তবু ৩ ঘণ্টা কোনো চিকিৎসা নয়
ইনসুলিন দেওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই রোগীর সুগার নেমে যায় ৩.১—যা জীবনসংকট অবস্থা।
অভিযোগ—নার্স শুধু দেখে এসে চলে যান। কারও জানানো হয়নি।
বোন নিজেই গার্ড পাঠিয়ে চিনি এনে মুখে দেন।
ডিউটি ডাক্তাররা দুপুর ২:৩০ পর্যন্ত RBS দেখেননি, কোনো ব্যবস্থা নেননি।
এটিই ছিল সবচেয়ে বড় চিকিৎসাগত ব্যর্থতা।
৩. ভোর ৪টায় হ্যালোপেরিডল—মনিটরিং ছাড়াই
স্ট্রোক রোগীর ক্ষেত্রে এই ওষুধ হাই-রিস্ক।
তারপরও দেওয়া হয়—
RBS মনিটরিং নেই,
Oxygen saturation নেই,
Consciousness চেক নেই।
শেষ মুহূর্তে ভুল পদ্ধতিতে Suction—১০ সেকেন্ডেই মৃত্যু
দুপুরে শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে নার্সরা কোনো স্যাচুরেশন না দেখে,
এয়ারওয়ে সিকিউর না করে, অক্সিজেন না দিয়ে সরাসরি সাকশন শুরু করেন।
মাত্র ১০ সেকেন্ডেই রোগীর ঠোঁট নীল হয়ে যায়, শ্বাস বন্ধ হয়ে যায়।
৫. মৃত্যুসনদে সত্য গোপন—Hypoglycemia নেই
ফাইলে RBS ৩.১ থাকা সত্ত্বেও মৃত্যুসনদে হাইপোগ্লাইসেমিয়ার কথা উল্লেখ করা হয়নি।
পরিবারের দাবি—এটি তথ্য গোপনের স্পষ্ট চেষ্টা। হাসপাতাল প্রশাসনের ভূমিকা—বিতর্ক আরও গভীর করে
রোগীর ফাইল দেখাতে প্রথমে টালবাহানা, পরে অনুমতি না দেওয়ার অভিযোগ করেছে পরিবার।
পরিবার BMDC-তে অভিযোগ করতে চাইলে হাসপাতাল তাদের সেখানেই যেতে বলে।
পরিবারের বক্তব্য—তাদের বারবার হয়রানি করা হয়েছে, ফাইল withheld করা হয়েছে।
অবশেষে হাসপাতালের Assistant Director (Medical Services)
ডা. ইশতিয়াক আমিন চৌধুরী নিজেই স্বীকার করেন—নার্স জানায়নি—এটি গুরুতর ভুল। তদন্ত হবে। চিকিৎসাব্যবস্থার গভীর অসুখ কি এই মৃত্যু আরও স্পষ্ট করল?
এই মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের নয়—এটি বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার আরেকটি মৃত্যুসনদ।
দায় কি একজন ডাক্তার?
একজন নার্স?
নাকি পুরো সিস্টেম—যেখানে নেই জবাবদিহি, নেই মনিটরিং, নেই মানবিকতা?
ডা. নুরিয়ার স্তব্ধ কণ্ঠে প্রশ্ন—আমি ডাক্তার হয়েও যদি বাবাকে বাঁচাতে না পারি, তাহলে সাধারণ মানুষ কীভাবে বাঁচবে?
পরিবারের দাবি—চারটি জরুরি পদক্ষেপ
১️ চিকিৎসায় অবহেলার সুষ্ঠু তদন্ত করতে হবে।
২️ দায়ী চিকিৎসক ও কর্মীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা, লাইসেন্স বাতিলসহ।
৩️ ভবিষ্যতে যেন আর কোন পরিবার এমন মৃত্যুযন্ত্রণার শিকার না হয়—এমন কঠোর নজরদারি ব্যবস্থা।
৪️ রোগীর ট্রিটমেন্ট শিট, RBS চার্ট, নার্সিং নোট, দায়িত্বপ্রাপ্ত স্টাফদের নাম দ্রুত সরবরাহ করতে হবে।
বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী পরিবার চিকিৎসা নথি পাওয়ার অধিকারী
BMDC Code of Medical Ethics – ধারা 60–62
ডাক্তার রোগীর বৈধ প্রতিনিধিকে রেকর্ড দিতে বাধ্য।
DGHS Hospital Service Standards. রোগীর পরিবার নথি দেখতে ও কপি পেতে পারে।
Right to Information Act, 2009 নিজ সম্পর্কিত তথ্য withholding করা অপরাধ।
দেশে অপচিকিৎসা ও অবহেলার ঘটনা বাড়ছে।
নুরিয়ার বাবার মৃত্যু সেই দীর্ঘ তালিকায় আরও একটি যোগ।
এ মৃত্যু শুধুই এক বাবার নয়—এটি দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার সতর্কবার্তা।
চিকিৎসা মানে জীবন বাঁচানো—আর অবহেলা মানে জীবন কেড়ে নেওয়া।
এখনই সময়—অপচিকিৎসার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর।
তথ্যসূত্র:এই প্রতিবেদনের সকল তথ্য সংগৃহীত হয়েছে মৃত বেদার আহমদের মেয়ে ডা. নুরিয়া জাহান কেয়ার ব্যক্তিগত ফেসবুক আইডি থেকে প্রকাশিত বিবৃতি থেকে।