বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, জন্মের প্রথম ১ ঘণ্টার মধ্যে শিশুদের বুকের দুধ খাওয়ানো হয় না এমন শিশু প্রতি ৫ জনের মধ্যে ৩ জন।
বাংলাদেশে মাতৃদুগ্ধ পানের হার তুলনামূলক ভালো হলেও মাত্র ৬৪% শিশু জন্মের পর থেকে ৬ মাস বয়স পর্যন্ত শুধুমাত্র মায়ের দুধ পান করে, বাকিরা তা পায় না।
তাই প্রতি বছর ১-৭ আগস্ট বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা মাতৃদুগ্ধ পানের সপ্তাহ হিসেবে পালন করে।
শিশু জন্মের প্রথম ১ ঘণ্টার মধ্যে বুকের দুধ খাওয়ানো শুরু করতে হবে।
জন্মের পর ৬ মাস বয়স পর্যন্ত শুধুমাত্র বুকের দুধ (পানি পর্যন্ত নয়) খাওয়াতে হবে।
৬ মাসের পর পরিপূরক খাবারের সঙ্গে ২ বছর বা তার বেশি সময় বুকের দুধ চালিয়ে যাওয়া প্রয়োজন।
মায়ের দুধের উপকারিতা (শিশুর জন্য)
০১. হরমোন নিঃসরণ ও মা-শিশুর বন্ধন
মায়ের বুকের দুধ খাওয়ালে অক্সিটোসিন এবং প্রোল্যাক্টিন হরমোন নিঃসৃত হয়, যা মাকে শিথিল করে এবং শিশুর প্রতি ভালোবাসা ও স্নেহ বৃদ্ধি করে।
জন্মের পরপরই বুকের দুধ খাওয়ালে মায়ের রক্তপাতের ঝুঁকি কমে এবং প্রসব পরবর্তী পুনরুদ্ধারে সহায়তা করে।
০২. প্রথম টিকা হিসেবে ভূমিকা
মায়ের দুধ শিশুর জীবনের প্রথম টিকা হিসেবে কাজ করে, যা শিশুকে প্রাকৃতিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা প্রদান করে এবং বিভিন্ন সংক্রমণ থেকে রক্ষা করে।
০৩. পূর্ণ পুষ্টির উৎস
মায়ের দুধে শিশুর জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের পুষ্টি উপাদান যেমন কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন, ফ্যাট, ভিটামিন ও মিনারেলস থাকে, যা সহজে হজম হয় এবং শরীর গঠনে সহায়তা করে।
০৪. কলোস্ট্রামের গুরুত্ব
জন্মের পর যে হলুদাভ ঘন দুধ তৈরি হয়, সেটি কলোস্ট্রাম নামে পরিচিত। এটি জীবাণু প্রতিরোধে অত্যন্ত কার্যকর এবং এতে অ্যান্টিবডি, অ্যান্টি-ব্যাকটেরিয়াল ও অ্যান্টি-ভাইরাল উপাদান থাকে, যা শিশুকে সংক্রমণ ও অ্যালার্জি থেকে রক্ষা করে।
০৫. মানসিক বিকাশ ও বুদ্ধিমত্তা বৃদ্ধি
মায়ের দুধপান করা শিশুরা শারীরিকভাবে সুস্থ হওয়ার পাশাপাশি মানসিক বিকাশ ও বুদ্ধিমত্তায় উন্নত হয়।
০৬. হঠাৎ শিশু মৃত্যু সিনড্রোম (SIDS) প্রতিরোধ
মায়ের দুধ হঠাৎ শিশু মৃত্যু সিনড্রোমের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে।
০৭. সংক্রমণ ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি
উচ্চ মাত্রায় ইমিউনোগ্লোবিন সমৃদ্ধ মায়ের দুধ শিশুকে কানের সংক্রমণ, পেটের সমস্যা, ডায়রিয়া, হাপানি, ডায়াবেটিস, অ্যালার্জি ও অন্যান্য রোগ থেকে সুরক্ষা প্রদান করে।
০৮. দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্য সুরক্ষা
বুকের দুধ পান করা শিশুদের ভবিষ্যতে জটিল রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা কমে এবং তারা বারবার অসুস্থ হওয়া থেকে রক্ষা পায়।
মায়ের জন্য উপকারিতা
প্রসব পরবর্তী ওজন দ্রুত কমাতে সহায়তা করে।
স্তন ও ডিম্বাশয়ের ক্যান্সারের ঝুঁকি কমায়।
জরায়ুর দ্রুত স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসতে সাহায্য করে।
হাড়ের ঘনত্ব বজায় রাখে ও অস্টিওপোরোসিস প্রতিরোধ করে।
কৃত্রিম দুধের ব্যবহারের কারণে বাড়তি অর্থ খরচ এড়ায়, ফলে পরিবারের খরচ সাশ্রয় হয়।
বুকের দুধের উপাদান
৮৭% পানি — শিশুর পিপাসা মেটায় এবং হাইড্রেশন নিশ্চিত করে।
৭% ল্যাকটোজ — শক্তির প্রধান উৎস।
৩.৮% চর্বি — শিশুদের বৃদ্ধি ও মস্তিষ্কের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ।
১% প্রোটিন — শরীর গঠনে সাহায্য করে।
ভিটামিন A, D, E, K, B12, ফলিক অ্যাসিড ও বিভিন্ন খনিজ পদার্থ — শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য উন্নত করে।
বুকের দুধ না খাওয়ানোর ঝুঁকি
শিশুর ডায়রিয়া ও নিউমোনিয়ার ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়।
কম ওজন ও দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হতে পারে।
মায়ের স্তন, জরায়ু ও ডিম্বাশয়ের ক্যান্সারের ঝুঁকি বেড়ে যায়।
মায়েদের জন্য পরামর্শ
জন্মের পর থেকে অন্তত ৬ মাস পর্যন্ত শুধুমাত্র বুকের দুধ খাওয়ান।
শিশুকে কোনো প্যাকেটজাত খাবার বা বাইরের কেনা গুড়া দুধ খাওয়াবেন না।
শিশুর সঠিকভাবে স্তন ধরার পদ্ধতি শিখে নিন, যাতে সে পর্যাপ্ত দুধ পায়।
মায়ের খাদ্য হোক স্বাস্থ্যসম্মত, পুষ্টিকর ও পর্যাপ্ত পরিমাণে।
লেখক: পুষ্টিবিদ লিনা আকতার
রাইয়ান হেলথ কেয়ার হসপিটাল এন্ড রিসার্চ সেন্টার, দিনাজপু