রাস্তার পাশে নয়, ভালোবাসার পাশে কাজী সুজন: রাস্তায় ফিরে আসছে মানবতার আলো, নিজ হাতে কাটলেন চুল, গোসল করিয়ে খাওয়ালেন উন্নত খাবার ভাইরাল “মানবিক সৈনিক”
নিজস্ব প্রতিবেদক | বরিশাল: সড়কের পাশে পড়ে থাকা ছিন্নমূল মানুষগুলোর প্রতি মানুষ সাধারণত চোখ ফিরিয়ে নেয়। কিন্তু এক যুবক নীরবে তাদের পাশে দাঁড়িয়ে যেন বদলে দিচ্ছেন রাস্তায় থাকা হাজারো অসহায় জীবনের গল্প।
রাস্তায় পড়ে থাকা ভবঘুরে, মানসিকভাবে ভারসাম্যহীন এবং অসহায় মানুষদের পাশে দাঁড়িয়েছেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একজন সাহসী ও মানবিক সৈনিক—ল্যান্স করপোরাল (গানার) কাজী সুজন। ঈদ-উল আযহার ছুটিতে নিজ গ্রামে ফিরে গিয়েও তিনি থেমে থাকেননি।
বরিশালের গৌরনদী উপজেলার টরকীর কাঁঠালতলী গ্রামের সন্তান সুজন বর্তমানে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর আর্টিলারি কোরে কর্মরত। ঈদের ছুটিতে বাড়ি ফিরে তিনি নিজের প্রতিষ্ঠিত স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের কর্মীদের সঙ্গে নিয়ে মানবতার অসাধারণ এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
ঈদের আগের দিন (৬ জুন) থেকে ৮ জুন পর্যন্ত তিন দিন ধরে তিনি গৌরনদী উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে থাকা ভবঘুরে (মানসিক প্রতিবন্ধী) পুরুষদের খুঁজে বের করে নিজ হাতে চুল ও দাড়ি কাটান, হাত-পায়ের নখ পরিষ্কার করেন এবং গোসল করিয়ে নতুন কাপড় পরিয়ে দিচ্ছেন তিনি ও তার দলের সদস্যরা। উন্নতমানের খাবার পরিবেশন করেন।
মানবিক এ কার্যক্রমের অংশ হিসেবে তারা আরেকজন মানসিক ভারসাম্যহীন বৃদ্ধকে খুঁজে বের করে তাকে খাবার ও নগদ সহায়তাও দেন। রাস্তায় দিনের পর দিন যাদের দিকে কেউ তাকায় না, তাদের জন্য কাজী সুজনদের এই ভালোবাসা যেন এক জীবন্ত উদাহরণ।
“মানুষ মানুষের জন্য”—এই মূলমন্ত্রে বিশ্বাসী কাজী সুজন বলেন, “এরা আমাদের সমাজেরই অংশ। একটু সহানুভূতি, একটু যত্ন আর ভালোবাসা দিলে তারাও আবার মানুষের মতো জীবন ফিরে পেতে পারে।”
এই হৃদয়স্পর্শী কর্মকাণ্ডের ভিডিও ও ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তা ব্যাপকভাবে ভাইরাল হয়ে যায়। অনেকেই তাকে “মানবতার সৈনিক”, “ভালোবাসার সুপার হিরো” বলে মন্তব্য করেছেন।
স্থানীয়রা তার এই কার্যক্রমের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন এবং বলছেন, এ ধরনের উদ্যোগ সমাজে একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের বার্তা দেয়।
🟩 উল্লেখ্য, কাজী সুজন একটি মানবিক সংগঠনের মাধ্যমে এসব কার্যক্রম পরিচালনা করছেন, যার লক্ষ্য হচ্ছে সুবিধাবঞ্চিত, অসহায় ও পথবাসীদের পাশে দাঁড়ানো
🔺 পূর্বেও মানবিকতার নজির স্থাপন করেছেন
এর আগেও ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির পাইন্দং ইউনিয়নের ভুজপুর এলাকায় ভয়াবহ বন্যার সময় অসহায়দের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন কাজী সুজন। হাঁটু পানিতে দাঁড়িয়ে নিজের হাঁটু সিঁড়ি বানিয়ে গর্ভবতী ও অসুস্থ নারীদের ট্রাকে উঠতে সাহায্য করার ছবিটি ভাইরাল হয়ে পড়ে সারাদেশে।
এই অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান তাঁকে বিশেষভাবে ধন্যবাদ ও পুরস্কৃত করেন।
🟢 স্বেচ্ছাসেবায় গড়া “গৌরনদী ব্লাড ডোনার্স ক্লাব” সহ একাধিক সংগঠন
কাজী সুজনের প্রতিষ্ঠিত স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনসমূহের মধ্যে উল্লেখযোগ্য
🔸 গৌরনদী ব্লাড ডোনার্স ক্লাব (GBDC)
🔸 টরকী বন্দরের ট্রাস্ট ওল্ড এজ এন্ড কেয়ার হোম
🔸 গৌরনদী অতিথি আপ্যায়ন ক্যাটারিং সার্ভিস
এই সংগঠনগুলোর মাধ্যমে তিনি স্বেচ্ছাসেবী যুবকদের সংগঠিত করে আর্তমানবতার সেবায় নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন।
🟩 মায়ের অনুপ্রেরণা, মানবতার পাশে থাকা এক জীবনদর্শন
তার প্রতিষ্ঠিত ওল্ড এজ হোমে আশ্রয় পেয়েছেন বহু পরিচয়হীন অসহায় নারী-পুরুষ। তাদের প্রতিদিনের খাবার রান্না করে খাওয়ান কাজী সুজনের মা নিজে। সুজন জানান, “মায়ের হাতে রান্না করা খাবার দিয়ে অসহায়দের মুখে হাসি ফোটাতে পারাটা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় আনন্দ।”
🟨প্রশাসনের ভূয়সী প্রশংসা
গৌরনদী উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট মো. রাজিব হোসেন বলেন—
“রাস্তার পাশে পড়ে থাকা অসহায়, নোংরা ও অবহেলিত মানুষদের সেবা দিয়ে আশ্রয়ের ব্যবস্থা করে কাজী সুজন যে মানবিকতা দেখিয়েছেন, তা সমাজের জন্য এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।”
🟣 কাজী সুজন যেন শুধু একজন সেনা সদস্য নন—তিনি সময়ের এক অনন্য অনুপ্রেরণা।
তার মতো একজন সৈনিকের হাতে দেশ ও মানবতা নিরাপদ—এমনটাই বিশ্বাস করছেন তার আশেপাশের মানুষজন।