আর্মিতে চান্স না পেয়েও বিশ্ববিদ্যালয় দ্বিতীয় স্থান অধিকার, সেরা সাফল্য অর্জনের গল্পটি ,,এম এ ইউসুফ এর ফেসবুক আইডি থেকে হুবাহুব তুলে ধরা হলো :-
আর্মিতে চান্স না পাওয়া এবং আমার জীবনের সেরা সাফল্য
আমি প্রথমবার আর্মিতে চান্স পাইনি এবং কেন পাইনি সেই গল্প আরেকদিন বলব যদিও এখন আমার ছাত্রদের এই গল্প বলে ক্লাস শুরু করি।
যাহোক আর্মিতে চান্স না পেয়ে আমার মাথায় পুরো আকাশ ভেঙে পড়ল, কারন আমি সহ আমার পরিবার, শিক্ষকমন্ডলি, বন্ধুরা সবাই নিশ্চিত ছিল আমি চান্স পাবই, একারনে কোন কিছুর জন্য প্রস্তুতি নেইনি। বুয়েটের ফর্ম পর্যন্ত তুলিনি, ভার্সিটির জন্য কোচিং করিনি,কোথাও পরীক্ষা দেইনি।
কিন্তু এখন কি হবে আমার??ISSB থেকে মিরপুর (খালার বাসায় থাকতাম) আসা পর্যন্ত মাথা কাজ করছিল না। বাসায় এসে রুম বন্ধ করে কিছুক্ষণ চিন্তা করলাম। এরপর ব্যাগ গুছিয়ে বের হয়ে গেলাম শেওড়াপাড়ায়,সেখানে একটা বাসায় কয়েকজন ক্লাসমেট মেস করে থাকত। তাদের গিয়ে বললাম আমাকে একটা বেড দিতে।
আর্মিতে চান্স পাওয়ার ব্যাপারে আমি এতটাই Over Confident ছিলাম যে, ক্যাডেট কলেজেই সব বই খাতা ফেলে এসেছিলাম। বুয়েট সহ প্রায় সব ভার্সিটির ভর্তি পরীক্ষা শেষ, বাকি আছে শুধু ঢাকা ভার্সিটি। ভেবে দেখলাম এই অল্প সময়ে সবগুলো বিভাগের প্রস্তুতি নেয়া যাবেনা। যেহেতু SSC এবং HSC তে মার্কস মোটামুটি ভাল থাকার কারনে মার্কস Portion এর স্কোর ভাল হবে তাই ঠিক করলাম ‘ঘ’ ইউনিটের জন্য প্রস্তুতি নিব।
হাতে ছিল ২ মাস, এই সময় বাইরের কেউ আমার চেহারা দেখেনি, দিন-রাত প্রস্তুতি নিতে থাকলাম। ঘুমের মাঝেও পড়া আওড়াতাম। এরকম পড়া আমি HSC এর আগেও পড়িনি। নির্ধারিত দিনে পরীক্ষা হলো। বাবা-মা সহ আত্মীয়রাও আমাকে নিয়ে খুব টেনশনে, কি হবে এই ছেলেকে দিয়ে? ক্যাডেট থেকে পাশ করে কোথাও চান্স পায়না,এই ৬ বছর তাহলে কি করল? আমার নিজেরও আত্মবিশ্বাস একদম তলানিতে। তাই পরীক্ষা দিয়ে কাউকে বলিনি পরীক্ষা কেমন হয়েছে। সোজা রংপুরে বাসায় গিয়ে আত্নগোপন করলাম। যাওয়ার আগে ঢাকা ভার্সিটিতে পড়ুয়া খালাতো ভাইকে রোল নাম্বার দিয়ে বললাম রেজাল্ট ভাল হলে জানাবা না হলে চুপ করে থাকবা।
ঢাকা ভার্সিটির ভর্তি পরীক্ষার রেজাল্ট ৩/৪ দিনের মাঝেই দেয়। এই কয়দিন আমি পাক্কা মুসলমান, পারলে তাহাজ্জুদ নামাজও পড়ি। কত কিছু যে মানত করেছিলাম, মনে হচ্ছিল কয়েক যুগ ধরে পুলসিরাত এর উপর দাড়ায় আছি। মংগলবার চলে গেল রেজাল্ট এর কোন খবর নাই, আমি রুমের এক কোনায় শুয়ে-বসে থাকি,মা মাঝে মাঝে এসে দেখে যায়,বাবা অফিস থেকে এসে ফিসফিস করে মাকে জিজ্ঞেস করে ‘ রেজাল্ট দিছে?বাবু ঠিক আছে?’।
বুধবার সারাদিন চলে গেল কোন খবর নাই, সারাদিন টেনশন করে একটু আগেই ঘুমিয়ে গেছি, মাঝরাতে হঠাৎ মা এসে ধাক্কা মেরে ঘুম ভাংগিয়ে বলে তোর রোল নাম্বার কত? সাদিক (খালাতো ভাই) পাশের বাসার টিএন্ডটিতে ফোন করেছে। আমি বললাম, ভাইকে তো নাম্বার দিয়েই আসছি। মা বলে ও আমাকে নিজ চোখে তোর এডমিট কার্ড দেখে নাম্বার নিয়ে যেতে বলেছে। তাহলে কি আমার নাম্বার রেজাল্ট শিটে খুঁজে পায়নি?? এডমিট কার্ড বের করে মা কে দিলাম,মা চলে গেল।
এদিকে আমি শীতের মাঝে ঘামা শুরু করেছি, তাহলে কি ঢাকা ভার্সিটিতেও চান্স পেলাম না,আমার রোল নাই??? ডিসিশন নিয়ে নিলাম,চান্স না পেলে আজকে রাতেই বাসা থেকে পালাব,বাংলা ছবির নায়ক এর মত প্রতিষ্ঠিত না হয়ে বাসায় ফিরবনা।
অনেকক্ষন পরে মা হাজির হয়ে রুমে ঢুকে আমাকে জড়িয়ে ধরে কান্না শুরু করলেন। আমি এখন বুঝতে পারছিনা তিনি কেন কাদছেন,কারন মা ভাল খবরেও কাদেন আবার খারাপ খবরেও কাদেন। এখনকার কারন কোনটা বুঝতে পারছিনা। কান্নার শেষের দিকে তিনি বললেন “তুই এত ভাল পরীক্ষা দিয়েছিস আমাকে বলিসনি কেন?” আমি বললাম ‘যাক তাহলে ঢাকা ভার্সিটিতে চান্স পেয়েছি’। মা বলল “শুধু চান্স না,তুই ভর্তি পরীক্ষার ২য় হয়েছিস।”🙄🙄🙄
এটা কি শুনলাম?? আমি বিশ্বাস করতে পারছিলাম না, মা বলে সাদিকও প্রথমে বিশ্বাস করেনি, এই জন্য আবার তোর রোল নাম্বার নিয়ে ভালো করে চেক করেছে!!! বুকের ভিতর থেকে হিমালয়সম পাথর নেমে গেল।
সেইদিনই প্রতিজ্ঞা করলাম জীবনে কোনদিন Over Confident হবনা আর জীবনের কাছে কোনদিন হার স্বীকার করবনা।
নিজের এই সাফল্যের কথা বলতে লজ্জা করছিল,কিন্তু মনে হল HSC পরীক্ষা দিয়ে ভর্তির জন্য যারা এখন প্রস্তুতি নিচ্ছে তাদের ১জনও যদি আমার এই লেখাটি পড়ে অনুপ্রেরণা পায় সেটাই সার্থকতা।
কষ্ট করে লেখাটি পড়ার জন্য ধন্যবাদ।