ভাষা আন্দোলন নিয়ে সিনেমা নির্মাণে আগ্রহী তরুণ নির্মাতারা
নিজস্ব প্রতিবেদক: আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি আমি কি ভুলিতে পারি? আজ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস।
এ দিনে ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য যারা জীবন দিয়েছেন, তাদের ভোলা যায় না। ভাষা আন্দোলনের রক্তিম বিশ্বজনীন যে ইতিহাস, তা স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে কালের খাতায়। আমরা মাথা উঁচু করে বলতে পারি, আমাদের একটি ভাষা আছে যার জন্য রক্ত দিয়েছি। পৃথিবীতে একটি জাতি আছে, যারা নিজের মুখের ভাষার অধিকারের জন্য তাদের বুকের তাজা রক্ত বিলিয়ে দিয়ে সে অধিকার অর্জন করেছে। সে জাতির নাম বাঙালি। রক্তের বিনিময়ে মুখের ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার পরও জাতির কাছে এখনো সর্বজনীন হয়ে উঠতে পারেনি বাংলা ভাষা। ফেব্রুয়ারি এলেই যেন ভাষার প্রতি প্রেম জাগরণ সৃষ্টি হয়। পরবর্তী প্রজন্মের কাছে ভাষা আন্দোলনকে তুলে ধরার জন্য এত বছর গড়িয়ে গেলেও উল্লেখযোগ্য কোনো পদক্ষেপ চোখে পড়েনি। মানুষের মনের কথা ও চিত্র মানুষ দেখতে পায় চলচ্চিত্রের মাধ্যমে। বাংলাদেশে প্রতি বছর কয়েক ডজন সিনেমা নির্মাণ হলেও ভাষা আন্দোলন নিয়ে সিনেমা হয়েছে কয়েকটি।
চলচ্চিত্রের ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, কীর্তিমান নির্মাতা ও চিত্রনাট্যকার জহির রায়হান ১৯৭০ সালে নির্মিত ‘জীবন থেকে নেয়া’ সিনেমায় বাংলা ভাষার আন্দোলন তথা একুশের কিছু চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। মূলত এ সিনেমার একটি গানই আজকের বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত। অন্যদিকে শহিদুল ইসলাম খোকন তার ‘বাঙলা’ সিনেমায়ও একুশের গল্প কিছুটা দেখানোর চেষ্টা করেছেন।
এছাড়া বেশ কয়েকজন চলচ্চিত্র নির্মাতা ভাষা আন্দোলন নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণের ঘোষণা দিয়েছিলেন, কিন্তু তা আর বাস্তব হয়ে ওঠেনি। ২০১৯ সালে অভিনেতা ও নির্মাতা তৌকীর আহমেদ ‘ফাগুন হাওয়ায়’ চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করলেও এটাকে পূর্ণাঙ্গ একুশের চলচ্চিত্র বলা যায় না।
এ কথা বলাই যায় যে ভাষা আন্দোলনকে উপজীব্য করে প্রত্যাশিত চলচ্চিত্র নির্মাণ হয়নি স্বাধীন বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পে। এটা আমাদের চলচ্চিত্রের জন্য চরম ব্যর্থতার একটি অধ্যায়। রাষ্ট্র ও বাংলা ভাষার প্রতি এক নির্মম অকৃতজ্ঞতার বহিঃপ্রকাশ।
যে ভাষার জন্য আমরা একসময় প্রাণ দিয়েছিলাম, স্বাধীনভাবে বাংলা ভাষায় কথা বলতে পারছি, সে ভাষার ইতিহাস পরবর্তী প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে কেন আমাদের এত অবহেলা?
বছরে কয়েক ডজন সিনেমা নির্মাণ হলেও ভাষা আন্দোলনের মতো এত ঐতিহাসিক ব্যাপারে কেন পর্যাপ্ত সিনেমা নেই, বিষয়টি নিয়ে দেশের তরুণ সিনেমা নির্মাতাদের কথা হয় বণিক বার্তার সঙ্গে। জানতে চাওয়া হয় এর কারণ।
নির্মাতা খিজির হায়াত খান বলেন, ‘আজ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। আমাদের মহান ভাষা শহীদদের আত্মত্যাগের ইতিহাসকে সন্মান করে একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে বিশ্বব্যাপী পালন করা হয়। তবে এটা অত্যন্ত দুঃখজনক যে ভাষা আন্দোলন নিয়ে আমরা হাতেগোনা কয়েকটা বাংলা চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে পেরেছি। খান আতাউর রহমানের “জীবন থেকে নেয়া”, তৌকীর আহমেদের “ফাগুন হাওয়ায়” ছাড়া তেমনভাবে আমাদের বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে পারিনি। মাত্র অল্প কয়েকটি চলচ্চিত্র আমাদের অস্তিত্বের ইতিহাস নিয়ে, এটা খুবই লজ্জার বিষয়। ইতিহাসনির্ভর চলচ্চিত্র নির্মাণে দুর্বল কাঠামো, বাজেটের স্বল্পতা, সঠিক ইতিহাস বিকৃতি ও রাজনৈতিকীকরণ, দেশের ইতিহাসের প্রতি তরুণ প্রজন্মের চরম অনাগ্রহ, দেশের চলচ্চিত্র শিল্পের ভরাডুবি—সবকিছুই এর জন্য দায়ী। সঠিক ইতিহাসের ভিত্তিতে ভাষা আন্দোলনসহ আরো ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে আমাদের চলচ্চিত্র নির্মাণ করার সময় এসেছে।’ভাষা আন্দোলন নিয়ে সিনেমা নির্মাণ করবেন কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ভেবে দেখিনি। তবে আমি চাই তরুণ প্রজন্ম ভাষা আন্দোলন নিয়ে সিনেমা বানাক।’
ভাষা আন্দোলন নিয়ে পর্যাপ্ত সিনেমা না থাকার কারণ হিসেবে তরুণ নির্মাতা রেদওয়ান রনি বলেন, ‘নির্মাতাদের সঙ্গে ভাষা আন্দোলনের সময়ের একটা দূরত্ব তৈরি হয়েছে। এছাড়া এ ধরনের সিনেমা তৈরির জন্য পৃষ্ঠপোষকতা দরকার, যা আমাদের দেশে নেই।’
রাষ্ট্রীয় সমন্বিত উদ্যোগের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ভাষা আন্দোলনের মনন ও উদ্দেশ্য কালে কালে ছড়িয়ে দেয়ার জন্য পদক্ষেপটা রাষ্ট্রেরই নিতে হবে। এ উদ্যোগ ব্যক্তি পর্যায়ে একজনের পক্ষে নেয়াটা কঠিন। এজন্য তথ্য মন্ত্রণালয়সহ সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়, মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়কে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।’
এ নিয়ে সিনেমা নির্মাণ সম্পর্কে রনি বলেন, ‘যদি পৃষ্ঠপোষকতা পাই, তাহলে সামনে অবশ্যই ভাষা আন্দোলন নিয়ে কাজ করার ইচ্ছা আছে।’
চলচ্চিত্র পরিচালক তপু খান বলেন, ‘ঐতিহাসিক গল্পে কাজ করতে হলে বড় আয়োজন আর অনেক বেশি গবেষণার প্রয়োজন। এ আয়োজনকে পৃষ্ঠপোষকতা করার মতো মানুষ আমাদের নেই। যখনই সরকার থেকে চেষ্টা করা হয় ভালো কিছু করার, তখন কিছু অসাধু চক্র নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য এটাকে ব্যবসায়িক জায়গা বানিয়ে কাজটাকে ছোট পরিসরে শেষ করে। যে কারণে সঠিক ইতিহাস পর্দায় উঠে আসে না।’ ভাষা আন্দোলন নিয়ে সিনেমা বানানোর আগ্রহ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘আমি ভাষা আন্দোলনের মতো ঐতিহাসিক বিষয় নিয়ে এক বছর গবেষণা করে কাজ করতে চাই। তবে তার জন্য অবশ্যই পৃষ্ঠপোষকতা থাকতে হবে।’
তরুণ নির্মাতা শঙ্খ দাস গুপ্ত বলেন, ‘ভাষা আন্দোলনের মতো এত বড় একটা পটভূমি নিয়ে কাজ খুবই কম।’ এ নিয়ে সিনেমা কম থাকার কারণ হিসেবে শঙ্খ দাস বলেন, ‘আমাদের সব বিষয় নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণের ক্ষেত্রে পূর্ণ স্বাধীনতা পাওয়া যায় কিনা এটাও একটা বড় বিষয়। এছাড়া এ ধরনের ঐতিহাসিক সিনেমা বানানোর জন্য যে ধরনের সাপোর্ট সিস্টেম থাকা দরকার, সেটা যথেষ্ট কম। অনেক নির্মাতা চাইলেই এ বিষয়ে সিনেমা নির্মাণের উদ্যোগ নিতে পারেন না। আমার মনে হয়, রাষ্ট্রীয়ভাবে এ ব্যাপারে আরো বেশি তৎপর হওয়া দরকার। তবে ইচ্ছা আছে. কখনো না কখনো আমি এ টপিকে সিনেমা নির্মাণ করব।’
চলচ্চিত্র পরিচালক রশিদ পলাশ বলেন, ‘ভাষা আন্দোলন নিয়ে আমাদের সিনেমা একেবারেই কম, যা আরো অনেক বেশি হওয়া দরকার ছিল। যেহেতু এটা অনেক বড় একটা অর্জন।
সূত্র – বণিক বার্তা