পশ্চিমবঙ্গের সাহিত্যের আরো যত গোয়েন্দা
নিজস্ব প্রতিবেদক।
পশ্চিমবঙ্গে গোয়েন্দা গল্পের কদর সবসময়ই ছিল। তবে সিনেমায় তা আসতে একটু দেরি হয়েছে বললে ভুল হবে না। সত্যজিৎ রায়ের হাত ধরে যার শুরু, তা একটা সময়স্তিমিত হয়ে গেলেও নিয়মিত বিরতিতে সিনেমা নির্মাণ হয়েছে। এর মধ্যে ব্যোমকেশ, ফেলুদার পাশাপাশি আছে কিরীটী রায়, শবর দাশগুপ্ত, একেন বাবু, কাকাবাবু, অর্জুন, দময়ন্তী, মিতিন মাসি, পিকে বাসু, বিমল-কুমার প্রমুখ। এদের নিয়ে কখনো বড় বাজেটের সিনেমা, আবার কখনো নির্মাণ হয়েছে টেলিভিশন ড্রামা। ২০১২-১৩ সালে শুরু হওয়া হাইপের ভেতর দিয়ে গোয়েন্দা সাহিত্য অবলম্বন করে সিনেমা নির্মাণ বাড়ে কলকাতায় এবং তা এখনো চলছে। শাশ্বত চট্টোপাধ্যায়কে নিয়ে অরিন্দম শীল তৈরি করেছিলেন শবর। শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের ‘ঋণ’ গল্প থেকে ২০১৫ সালে মুক্তি পায় ‘এবার শবর’ এবং পরের বছর আসে ‘ঈগলের চোখ’। দুটো সিনেমাই মোটামুটি আলোচিত। লালবাজারের গোয়েন্দা শবর চরিত্রে শাশ্বতকে পছন্দ করেছে দর্শক। এ সিরিজে শবরের সহকারী নন্দলাল চরিত্রে অভিনয় করেছেন শুভ্রজিৎ দত্ত। সাব ইন্সপেক্টরের একটি চরিত্রে আছেন গৌরব চক্রবর্তী। শবর সিরিজের গল্পগুলো ‘বড়দের গল্প’। যৌনতা এ গল্পে অপরাধের পেছনের অন্যতম কারণ। তাই সিনেমাগুলো সব মহলে চর্চিত না হওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু গল্পগুলো পাঠক মহলে জনপ্রিয় হওয়ায় আগে থেকেই আলোচিত ছিল। এছাড়া অরিন্দম শীল এ ধারার সিনেমা ভালো বানাতে পারেন। এ কারণে সিনেমাগুলো এক শ্রেণীর দর্শক পছন্দ করেছেন। ২০২২ সালে সর্বশেষ মুক্তি পায় ‘তীরন্দাজ শবর’। সাহিত্যের জনপ্রিয় চরিত্রগুলোর মধ্যে বাকি রইল কে? কাকাবাবু? তিনি নিজেকে গোয়েন্দা বলেন না, কিন্তু আদতে তিনিও গোয়েন্দা। তাকে নিয়েও সৃজিত মুখার্জি ‘এক্সপেরিমেন্ট’ করেছেন। সুনীলের সৃষ্টি এ চরিত্রকে নিয়ে সম্প্রতি সিনেমা করেছেন সময়ের জনপ্রিয় পরিচালক সৃজিত। প্রসেনজিৎকে কাকাবাবুর চরিত্রে বসিয়ে তৈরি করেছেন ‘মিশর রহস্য’ ও ‘ইয়েতি অভিযান’। কিন্তু কাকাবাবুর আবেদন সেলুলয়েডে ফোটাতে ব্যর্থ তারা। এর পরও থামেননি। ২০২২ সালে মুক্তি পায় কাকাবাবুর প্রত্যাবর্তন। সিনেমায় অনির্বাণ চক্রবর্তীকে আনা হয় একটি চরিত্রে, যার হাবভাব পুরোই জটায়ুর মতো। টোটা রায়চৌধুরীকে ‘ফেলুদা’ হিসেবে ওয়েব সিরিজ বানিয়েছেন সৃজিত। সেখানে জটায়ু চরিত্রে ছিলেন অনির্বাণ চক্রবর্তী। তবে কাকাবাবুকে আরো আগে আবিষ্কার করেছিলেন কিংবদন্তি চলচ্চিত্রকার তপন সিংহ। ১৯৭৯ সালে তিনি নির্মাণ করেন সবুজ দ্বীপের রাজা। কাকাবাবু তথা রাজা রায়চৌধুরীর চরিত্রে ছিলেন তার প্রিয় অভিনেতা সমিত ভঞ্জ। এছাড়া সিনেমায় নানা চরিত্রে ছিলেন লিলি চক্রবর্তী, রবি ঘোষ, নির্মল কুমার প্রমুখ। এটি আজও দর্শককে টানে। ১৯৯৫ সালে কাকাবাবু হয়েছিলেন সব্যসাচী চক্রবর্তী। পিনাকি চৌধুরী নির্মাণ করেন ‘কাকাবাবু হেরে গেলেন?’ একই সেট আপে ছয় বছর পর নির্মাণ করেন ‘এক টুকরো চাঁদ’। সন্তু ও এক টুকরো চাঁদ অবলম্বনে সিনেমাটি নির্মিত। এতে সন্তুর চরিত্রে ছিলেন সোহম চক্রবর্তী।
এত কথা বলার পরও একজন বাদ থেকে যায়। পশ্চিমবঙ্গ বা বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি বিক্রীত গোয়েন্দা সম্ভবত ‘কিরীটী রায়’। নীহাররঞ্জন গুপ্তর সৃষ্টি অমর চরিত্র। ‘কালো ভ্রমর’ নামে কিরীটী সর্বাধিক পরিচিত। কিরীটীকে নিয়ে একের পর এক গল্প লিখেছেন নীহাররঞ্জন। এগুলোও বেশির ভাগ বড়দের গল্প। বিকৃত কাম থেকে শুরু করে বিকৃত অপরাধ সবই ছিল তার গল্পে। ১৫ খণ্ডের কিরীটী সমগ্র দে’জ পাবলিকেশনস থেকে প্রকাশ হয়েছে। ইংরেজি বাংলা মিশিয়ে কথা বলা কিরীটীর ব্যক্তিত্বে মুগ্ধ হয়েছে অনেক পাঠক। ফেলুদার পর সবচেয়ে জনপ্রিয় হয়তো কিরীটী রায়। তবে তার তদন্ত, রহস্য আর গ্রন্থিমোচনে থেকে যায় অনেক ফাঁক। কিন্তু তাই বলে কিরীটী নিয়ে সিনেমা হবে না? ইন্দ্রনীল সেনগুপ্ত হাজির হয়েছেন কিরীটী হিসেবে। তার আগে পরে চিরঞ্জিত চক্রবর্তী অভিনয় করেছেন এ চরিত্রে। এখন পর্যন্ত বড় পর্দায় চারটি সিনেমা নির্মাণ হয়েছে কিরীটীকে নিয়ে। ২০১৬ সালে নির্মিত কিরীটী ও কালো ভ্রমর সিনেমায় কিরীটী চরিত্রে অভিনয় করেছেন ইন্দ্রনীল সেনগুপ্ত। একই বছর অনিকেত চট্টোপাধ্যায় পরিচালিত ‘কিরীটী রায়’ সিনেমায় অভিনয় করেন চিরঞ্জিত। পরের বছর অনির্বাণ পারিয়ার ‘এবং কিরীটী’তে ছিলেন প্রিয়াংশু চ্যাটার্জি। ২০১৮ সালে বিকাশ দত্তের নীলাচলে কিরীটীতে আবার এ চরিত্রে ফেরেন ইন্দ্রনীল।
শার্লক বরাবরই বলেছেন মগজটাকে কাজে লাগাতে। প্রায় একই কথা বলেছেন আগাথার সৃষ্টি এরকুল পোয়ারো। মিস মার্পল অবশ্য বলতেন মানুষের সঙ্গে মিশে, তাদের সঙ্গে কথা বলে মানুষকে চিনে রহস্য সমাধান করতে হয়। সব গোয়েন্দাই বুদ্ধির চর্চায় গুরুত্ব দিতেন। কিন্তু তাই বলে সব গোয়েন্দা গম্ভীর হবে এমন নয়। যেমন পোয়ারোকে কখনই গম্ভীর বলা চলে না। তবে হালে সুজন দাশগুপ্ত ‘একেনবাবু’ নামে এক গোয়েন্দা চরিত্র সৃষ্টি করেছেন, যিনি এক রকম কমেডিয়ান। কিন্তু তারও বুদ্ধি কম নয়।
একেন বাবু বেশ জনপ্রিয় হয় গত দশকের শেষের দিকে। তিনি এমন এক গোয়েন্দা, যাকে দেখলে ও যার কথা শুনলে আকাট মূর্খ মনে হবে। অনেকটাই জটায়ুর আদলে আঁকা তার চরিত্র। অনির্বাণ চক্রবর্তীকে এ চরিত্রে রেখে সিরিজ ও সিনেমা নির্মাণ হয়েছে বেশ কয়েকটি। মূলত কমিক রিলিফের কারণেই দর্শক এটি গ্রহণ করেছে। রহস্য কাহিনী বা গোয়েন্দা হিসেবে একেন একেবারেই পোক্ত নয়। মিস মার্পলের কথা হচ্ছিল। আগাথা ক্রিস্টির এ অমর সৃষ্টির মতো বাংলা সাহিত্যেও দুই-একজন নারী গোয়েন্দা আছেন। প্রভাবতী দেবী সৃষ্টি করেছিলেন কৃষ্ণাকে। তবে তাকে নিয়ে সিনেমা হয়নি। সুচিত্রা ভট্টাচার্যের ‘মিতিন মাসি’কে নিয়ে হয়েছে। একটু দেরি করেই হয়েছে সিনেমা। কোয়েল মল্লিককে মিতিন চরিত্র নিয়ে সিনেমা নির্মাণ করেছেন অরিন্দম শীল। তবে এর আগে নন্দিতা রায় ও শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় চেয়েছিলেন ঋতুপর্ণাকে নিয়ে সিনেমা নির্মাণ করতে। নানা কারণেই তা হয়নি। মনোজ সেনের ‘দময়ন্তী’কে নিয়ে নির্মাণ হয়েছে সিরিজ। তুহিনা দাস অভিনয় করেছেন এ চরিত্রে।
উকিল হলেও পিকে বাসু গোয়েন্দার মতোই। নারায়ণ সান্যালের এ চরিত্রকে সিনেমায় প্রথম (১৯৭৪) আনেন তরুণ মজুমদার। পিকে বাসুর চরিত্রে অভিনয় করেন উত্তম কুমার। শাশ্বত চট্টোপাধ্যায়কে পিকে বাসুর কোট পরিয়ে এ বছর সিরিজ বানিয়েছিলেন জয়দীপ মুখার্জি। ভালো হয়নি সেটা।
সূত্র – বণিক বার্তা