সিঙ্গাপুরে ন্যূনতম বৈশ্বিক করের বিপরীতে বিনিয়োগ প্রণোদনা অনুমোদন
নিজস্ব প্রতিবেদক।
অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (ওইসিডি) এক প্রস্তাবে সম্প্রতি একমত হয়েছে ১৪০টির বেশি দেশ। এ প্রস্তাব অনুসারে, কার্যক্রম পরিচালনা করা দেশে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর (এমএনসি) মুনাফার ওপর ন্যূনতম ১৫ শতাংশ বৈশ্বিক কর আরোপ হবে। এ নিয়ে করপোরেট জগতে আপত্তির সুর ওঠায় অনেক দেশ প্রণোদনার সুবিধা নিয়ে ভাবছে। বিষয়টিতে তুলনামূলক এগিয়ে গেল পূর্ব এশিয়ার বাণিজ্য কেন্দ্র সিঙ্গাপুর। সম্প্রতি দেশটির পার্লামেন্টে প্রণোদনাসংক্রান্ত একটি বিল পাস হয়েছে। খবর দ্য স্ট্রেইটস টাইমস।
নতুন এ বিল কিছু ট্যাক্স প্রণোদনা পরিমার্জনের মাধ্যমে বিনিয়োগবান্ধব হয়েছে। ২০২৫ সাল থেকে সিঙ্গাপুরে বিনিয়োগ করতে চাওয়া কোম্পানি ১৫ শতাংশ গ্লোবাল মিনিমাম ট্যাক্স আরোপ করার আগে এ সুবিধা পাবে। গত সোমবার পার্লামেন্টে বিষয়টি নিশ্চিত করেন সিঙ্গাপুরের বাণিজ্য ও শিল্প বিষয়ক মন্ত্রী আলভিন ট্যান। তিনি জানান, বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে এবং নাগরিকদের জন্য ভালো মানের চাকরি সৃষ্টি করতে নতুন নতুন প্রণোদনা সুবিধার মাধ্যমে সিঙ্গাপুরকে এগিয়ে যেতে হবে। আলভিন ট্যানের মতে, বিশ্বমানের অবকাঠামো, উন্নত জনশক্তি, ভালো আর্থিক ব্যবস্থা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা সিঙ্গাপুরকে বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের কাছে ভালো অবস্থানে রেখেছে। তবে এমন কিছু ব্যবস্থা করা উচিত, যাতে বহুজাতিক করপোরেশনগুলো বিনিয়োগ অব্যাহত রাখে।
ভূরাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক উত্তেজনার কারণে সাম্প্রতিক বছরে সিঙ্গাপুরে বিনিয়োগ বেড়েছে। একই সময়ে এসব উত্তেজনা বৈশ্বিক বাণিজ্যিক ব্যবস্থার বিঘ্ন ঘটিয়েছে। ফলে ভবিষ্যতে বিনিয়োগ প্রবাহ অনিশ্চিত হয়ে উঠতে পারে। ২০২৪ সালের বাজেটে ঘোষিত কিছু ট্যাক্স প্রণোদনা বাস্তবায়ন প্রসঙ্গে আলোচনায় নতুন বিলটি উত্থাপন করেন আলভিন ট্যান। নতুন প্রণোদনা সম্পর্কে তার মত, বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সিঙ্গাপুরকে আরো নমনীয় ও নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এ কারণে কৌশল ও বিনিয়োগের উপকরণের পরিবর্তন এনে আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে হবে।
সিঙ্গাপুরের ইকোনমিকস এক্সপেনশন ইনসেনটিভস অ্যাক্টে নতুন এ সংশোধনী বিনিয়োগকারীদের আয়কর কমাতে সাহায্য করবে। এটি ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড এক্সপ্যানশন প্রণোদনা (ডিইআই) স্কিমের জন্য ১৫ শতাংশের নতুন একটি কম ট্যাক্স হার স্তর অন্তর্ভুক্ত করেছে। ১৯৬৭ সালে প্রবর্তিত হয় ইকোনমিকস এক্সপেনশন ইনসেনটিভস অ্যাক্ট, যা পরবর্তী সময়ে একাধিক সংশোধনের মাধ্যমে কোম্পানির সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সিঙ্গাপুরে নতুন বা কার্যক্রম সম্প্রসারণে উৎসাহিত করেছে।
মন্ত্রী আলভিন ট্যান বলেন, ‘সিঙ্গাপুর সময়ে সময়ে ট্যাক্স প্রণোদনাগুলো পর্যালোচনা করে থাকে, যাতে প্রণোদনাগুলো বিভিন্ন পরিস্থিতিতে কোম্পানির জন্য প্রাসঙ্গিক থাকে।’
বড় এমএনসিগুলো একটি ১৫ শতাংশ গ্লোবাল মিনিমাম ট্যাক্সের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। এটি বেস ইরোশন অ্যান্ড প্রফিট শিফটিং (বিইপিএস ২.০) পিলার টু নিয়মের অধীনে বাস্তবায়ন হবে। ওইসিডি প্রবর্তিত বিইপিএস নিয়মের লক্ষ্য হলো, এমএনসিগুলো যেখানে কাজ করবে সেখানেই যেন সঠিক পরিমাণে কর দেয়। সিঙ্গাপুর ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি বা পরের বছরের শুরুর দিকে পিলার টু বাস্তবায়ন করবে।
আলভিন ট্যান আরো জানান, ডিইআই সুবিধা প্রযোজ্য, এমন কোম্পানির আয় ও কাজের পরিসর সম্প্রসারণ করেছে বিলটি। এতে সিঙ্গাপুরে প্রধান কার্যালয় নেই এমন কোম্পানিও ৪০ বছরের জন্য প্রণোদনা পেতে সক্ষম হবে। এমন কোম্পানির মধ্যে রয়েছে পেমেন্ট প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা উড়োজাহাজ রক্ষণাবেক্ষণ পরিষেবা প্রদানকারী।
পার্লামেন্ট সদস্যদের প্রশ্নের জবাবে সিঙ্গাপুরের বিনিয়োগ বিষয়ক মন্ত্রী বলেন, ‘পুরো বিলটি ব্যবসায়িক নমনীয়তা নিশ্চিত করতে তৈরি করা হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, যদি বাহ্যিক বা বিনিয়োগের পরিবেশ পরিবর্তন হয়, তাহলে এটি অর্থনৈতিক সংস্থা ও কোম্পানির জন্য আলোচনা করার সুযোগ সৃষ্টি রাখবে।’
ডিইআই প্রণোদনা ছোট ও মাঝারি আকারের প্রতিষ্ঠানে প্রযোজ্য হবে কিনা, এমন প্রশ্নে আলভিন ট্যান বলেন, ‘এ ট্যাক্স হার যোগ্য কোম্পানির জন্য প্রযোজ্য হবে, সেখানে উৎস দেশ, কোম্পানির আকার বা বিইপিএস পিলার টুর আওতায় থাকাও কোনো বিষয় নয়।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের অর্থনৈতিক দর্শন হলো সেসব কোম্পানিকে সবসময় সমর্থন করা, যারা সিঙ্গাপুরে অর্থনৈতিক মূল্য সৃষ্টি করতে পারে এবং যে কোম্পানি এমন অবদান নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’
তিনি আরো বলেন, ‘ডিইআই সুবিধার নতুন আবেদন বা বিদ্যমান সুবিধা সংশোধনীর আবেদন প্রতিটি ক্ষেত্রে যথাযথ প্রক্রিয়ায় মূল্যায়নের মধ্য দিয়ে যাবে। প্রতিটি প্রকল্পের যোগ্যতা বিচার করা হচ্ছে। এ সুবিধা পেতে কোম্পানিকে সিঙ্গাপুরে উচ্চ মানের কার্যক্রমে নিযুক্ত হতে হবে বা নতুন সেটআপ তৈরি বা বিদ্যমান কার্যক্রম সম্প্রসারণ করতে হবে। ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট বোর্ড বা এন্টারপ্রাইজ সিঙ্গাপুরের মতো অর্থনৈতিক সংস্থাগুলো নতুন বা পরিমার্জিত প্রকল্পের মূল্যায়ন করবে।
মূল্যায়নের দুটি দিক রয়েছে। এর মধ্যে কোয়ান্টেটিভ ইকোনমিক বেনিফিট বা পরিমাণগত অর্থনৈতিক সুবিধায় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে দক্ষ কর্মসংস্থান, স্থির সম্পদ বিনিয়োগ এবং মোট ব্যবসায়িক ব্যয়ের প্রতিশ্রুতি। অন্যদিকে কোয়ালিটিটিভ ইকোনমিক বেনিফিট বা গুণগত সুবিধার মধ্যে অর্থনীতিতে নতুন কিছু সৃষ্টির সম্ভাবনা, প্রকল্প থেকে সৃষ্ট চাকরির গুণমান এবং প্রযুক্তি, দক্ষতা ও সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি।
সূত্র – বণিক বার্তা