আরিফ হুসাইন:- আবহাওয়ার কথা না লিখলে চিঠি পরিপূর্ণ হয় না। সারাদিন ভ্যাপসা গরম পড়েছিল খুব, সন্ধ্যার পর থেকে আকাশ মেঘলা। রাত ঘন হলে বৃষ্টি নামবে হয়তো। আয়োজন করে বৃষ্টি দেখো আগের মত এখনও? আচ্ছা কেমন আছো বলো? হুমায়ূন কী পড়ো রাত জেগে? শুনেছি এবার বর্ষাকাল দীর্ঘ হবে। তোমার আমার দীর্ঘদিন দেখা না হবার মত দীর্ঘ। গত বর্ষায় চমৎকার একটা কাণ্ড ঘটে গেছে জানো? সেবার কলকাতা থেকে ফিরার সময় যে গাছটা দিয়েছিলে সে গাছটাতে খুব ফুল ফুটেছে। প্রতিটি ডালে ডালে কামিনী ফুলের ছড়াছড়ি। রাত হলেই ফুলের গন্ধে সারাটা বাড়ি ঘোর ভূতূড়ে হয়ে ওঠে। বর্ষায় নদীতে এত জোয়ার আর হাওয়া ছিল যে জানালা খুলে দিলে নদীর জলের টলটে শব্দ শোনা যেত, হওয়ার সাথে ঘরে ঢুকে যেত কামিনী ফুলের ঘ্রাণ। ভেবেছিলাম একবার হাওয়ার কাছে বলেকয়ে তোমার কাছে পৌছে দিব কিছু ফুলের সৌরভ।
তুমি তো ভালো করেই জানো আমি চিঠি লিখতে জানি না। জানিনা বলেই ভাবতে হয় আর কি কি লিখবো চিঠিতে। রাজনৈতিক অস্থিরতার কথাও লেখা যায়, লেখা যায় ক্ষুধার কথা। প্যা*লেস্টাইন এর দিকে তাকালে আমার শুধু মনে হয়, পৃথিবীর জাতীয় সঙ্গীত ক্ষুধা। ওখানকার শিশুরা ঘাসের স্যুপ খায়। আমরা যে গনতন্ত্র হারিয়েছি এটা প্রায় নিশ্চিত। বলা যেতে পারে দূর্নিতি যুক্ত উন্নয়নরত ঝুরঝুরে আনাম ব্রিজের মত আমাদের অর্থনীতি ঝুরঝুরে হয়ে ধসে পড়বে হঠাৎ। হতে পারে মানুষ আবারও বলতে পারে রাজপথের মিছিলে, ভাত দে হারামজাদা। এদিকে গেল বছর গোটা একটা শহর পুড়ে গেল আগুনে। মানুষও পুড়েছে ভীষণ। বহুদিন তোমাকে দেখতে না পেরে আমার হৃদয়ও যে পুড়ছে সে কথা না হয় নাই লিখলাম।
এমন কেনো হলো শ্রুতি ? সব এমন উল্টেপাল্টে গেলো কেন? আচ্ছা সত্যি করে বলো তো আমায় কী তুমি ভালোবাসতে না? জানার বড় ইচ্ছে হয়।
তোমার মনে আছে? তোমার সঙ্গে প্রথম যেদিন দেখা হয়েছিল সেদিন তুমি সবুজ রঙের একটা শাড়ি পরেছিলে। চারদিকে মাগরেবের আযানের সুর ভাসছিল। এত মধুর শুনালো সে আযানের সুর ওই মূহুর্তে। আযান শেষ হওয়ার পর তোমার দিকে তাকিয়ে আমার প্রথম কথা ছিলো “সবুজ শাড়িতে তোমায় দেখতে সুনীলের কবিতার মত লাগে”। আমার কথা শুনে লজ্জায় তোমার গাল দু’টো এত লাল হলো, আমার দিকে তাকাতেই পারছিলে না।
আমাদের গেছে যে-দিন একেবারেই কী গেছে শ্রুতি? ধর্ম তো মানুষকে ভালোবাসতে শেখায়, তাহলে আমাদের এমন আলাদা করে ছাড়লো কেন? তোমার স্মৃতি কাঁটাতারের মত বিঁধে আছে বুকের গোপনে। মাঝেমধ্যে পুরোনো স্বভাব পেয়ে বসে আমাকে খুব করে, তখন তোমার ঘন চুলে আমার প্রতিটি আঙুল ডুবিয়ে আদর করতে ইচ্ছে করে। কিন্তু তুমি তো আমার কাছে নেই! আমার এখানে পাশের ফ্লাটে একটা মেয়ে থাকে। দেখতে তোমার মতো। ছাদে প্রায়শই বিকালে ফুল গাছে জল দিতে আসে। মেয়েটাকে দেখলে খুব মায়া লাগে। শুনেছি মেয়েটা করুণ ক্যান্স্যারে ভুগছে। মায়া বড্ড খারাপ জিনিস শ্রুতি; মায়া সমুদ্রের মতো। মানুষ ওখানে টুপ করে ডুবে যায়। আর ফিরতে পারে না। আমিও পারছি না কিছুতেই।
কোন কোন রাতে অপূর্ব জোছনা হয়। আজকের বৃহস্পতিবার রাতের আসমানেও সেরকম অপূর্ব জোছনা হয়েছে। আমার সারা ঘর নরম আলোয় ভাসছে। গৌতম বুদ্ধের মতো গৃহত্যাগী হতে ইচ্ছে করলেও হতে পারছি না। আমার তো ঘরই নেই। যেই ঘর আছে সেটাকে নরক মনে হয়। কথা আর অজস্র গল্প নিয়ে সারাদিন পর ঘরে ফিরে দেখি ওইসব গল্প, কথা বলার কোথাও একটা মানুষ নেই। আমি তো তোমার ভেতর নিজের একখানা ঘর বানিয়ে রেখেছিলাম সারাদিনের ক্লান্তি নিয়ে ফিরবো বলে। সে ঘর বার্তাহীন ঝড় এসে ভেঙে নিয়ে গেছে। আমি আর নতুন করে ঘর বানাতে পারছি না শ্রুতি। আমি আমার কাছে ফিরতে পারছি না।
গভীর রাতে ঘুম ভেঙে যায়। ছাড়া ছাড়া অদ্ভুত সব স্বপ্ন দেখি। শরীর অথবা মনে অসুখবিসুখ লেগেই আছে। ঘুম ভাঙলে চারপাশের সবকিছু অচেনা লাগে। জলের তৃষ্ণায় গলা শুঁকিয়ে যায়। একা একা ঘর থেকে বেরিয়ে নদীর পাশে গিয়ে বসে থাকি। জোছনার আলোয় ছোট ছোট মাছ ধরার ডিঙি নৌকা দেখা যায়। জীবনানন্দ দাশের কবিতার ওই দুইটি লাইন মনে পড়ে, “ফাল্গুনের রাতের আঁধারে যখন গিয়েছে ডুবে পঞ্চমীর চাঁদ
মরিবার হ’লো তার সাধ”। আমার খুব মরে যেতে ইচ্ছে করে আজকাল শ্রুতি।
আজকের মতো এমনই কোন এক জোছনায়ময় বৃহস্পতিবার রাত্তিরে তোমাকে দেখার গাঢ় তৃষ্ণা নিয়ে আমি যদি সত্যি সত্যি মরে যাই; আমার নামে তুমি আকাশে ওড়াই দিও একশো একটা ফানুস।
গল্প লেখক -আরিফ হুসাইন ( বৃহস্পতিবার)