রবিউল ইসলাম: কোটা আন্দোলনে রাজনীতি, শ্রমিক আন্দোলনে রাজনীতি – কোথায়নেই রাজনীতি? আমাদের দেশের শিরা-উপশিরায় যেন রাজনীতির অনুপ্রবেশ ঘটেছে। মানুষের অসুস্থতায় রাজনীতি, মৃত্যুতেও রাজনীতি; সহযোগিতায় রাজনীতি, জানাজায় রাজনীতি, নামাজে রাজনীতি, রোজায় রাজনীতি, পূজায় রাজনীতি। হাট-বাজার থেকে মাজার, ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠান – সবখানেই যেন রাজনীতির অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণ!
প্রশ্ন হলো, একটি রাষ্ট্রের সাধারণ মানুষ কি কখনো রাজনীতির প্রভাবমুক্ত হয়ে স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকার অধিকার পাবে না?
রাজনীতির নামে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, স্বার্থের সংঘাত আর আধিপত্য বিস্তারের প্রতিযোগিতায় বারবার বলি হচ্ছেন নিরীহ মানুষ। কখনো পুলিশের লাঠিচার্জ, কখনো টিয়ারশেল, কখনো রাবার বুলেট, আবার কখনো প্রাণঘাতী গুলিতে ঝরে যাচ্ছে মানুষের প্রাণ। অন্যদিকে, সংঘাতের একপর্যায়ে আন্দোলনকারীদের হাতেও প্রাণ হারাচ্ছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। অথচ নিহত পুলিশ সদস্য কিংবা নিহত আন্দোলনকারী – উভয়েই এই দেশের নাগরিক। উভয়েরই পরিবার আছে, স্বজন আছে, বেঁচে থাকার স্বপ্ন আছে।
তাহলে প্রশ্ন জাগে – কেন এই রক্তপাত? কার নির্দেশে, কিসের স্বার্থে, কার ক্ষমতার মসনদ রক্ষায় কিংবা কার রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা পূরণে সাধারণ মানুষের বুক ঝাঁঝরা হয়? রাষ্ট্রের দায়িত্ব কি নাগরিকের জীবন রক্ষা করা, নাকি রাজনৈতিক স্বার্থের সংঘাতে নাগরিকের জীবন বিপন্ন করা ?
২০২৪ সালের জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের নির্বিচার গুলি ও প্রাণহানির স্মৃতি এখনো জাতির বিবেককে নাড়া দেয়। সেই রক্তাক্ত অধ্যায়ের ক্ষত শুকাতে না শুকাতেই ২০২৬ সালের অক্টোবর – নভেম্বরে গার্মেন্টস শ্রমিকদের আন্দোলন ঘিরে আবারও পুলিশের লাঠিচার্জ, টিয়ারশেল ও বলপ্রয়োগের অভিযোগ সামনে এসেছে। একই রাষ্ট্রে, একই জনগণের ওপর বারবার কেন এমন পরিস্থিতি তৈরি হবে? কেন দাবি আদায়ের আন্দোলন শেষ পর্যন্ত রক্তপাতের ঘটনায় রূপ নেবে?
শ্রমিকেরা কি অন্যায় কিছু চান? তারা তো কেবল নিজেদের শ্রমের ন্যায্য মূল্য চান। চান সময়মতো বেতন, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, পরিবারের মুখে দুমুঠো খাবার তুলে দেওয়ার নিশ্চয়তা। দিনের পর দিন ঘাম ঝরিয়ে যাঁরা দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখেন, তাঁদের ন্যায্য দাবি কেন রাজপথের সংঘাতের কারণ হবে? কেন তাঁদের দাবি শোনার পরিবর্তে বলপ্রয়োগের অভিযোগ উঠবে?
মনে রাখতে হবে, আন্দোলনকারীরা শত্রু নন, পুলিশও শত্রু নয়। শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষা – দুটিই রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। মতপ্রকাশ ও শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের অধিকার যেমন নিশ্চিত করতে হবে, তেমনি সহিংসতা ও প্রাণঘাতী বল প্রয়োগের ঘটনাও নিরপেক্ষ তদন্তের আওতায় আনতে হবে। কোনো পক্ষের অপরাধই রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে দায়মুক্তি পাওয়ার সুযোগ থাকা উচিত নয়।
আমরা এমন রাজনীতি চাই না, যে রাজনীতিতে মানুষের জীবনের চেয়ে ক্ষমতার মূল্য বেশি। এমন রাজনীতি চাই না, যেখানে মানুষের মৃত্যু নিয়ে চলে দলীয় হিসাব-নিকাশ, শোকের মধ্যেও চলে স্বার্থের বাণিজ্য, আর সাধারণ মানুষের কান্না চাপা পড়ে রাজনৈতিক স্লোগানে।
প্রশ্ন এ দেশের নীতিনির্ধারকদের কাছে- কবে বন্ধ হবে অপরাজনীতির এই দৌরাত্ম্য? কবে রাজনীতি মানুষের অধিকার ও কল্যাণের হাতিয়ার হবে? কবে রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিক নিরাপদে নিজের মত প্রকাশ করতে পারবেন? কবে একজন শ্রমিক নিজের ঘাম ঝরানো উপার্জনে পরিবারের মুখে দুমুঠো ভাত তুলে দিয়ে শান্তিতে ঘুমাতে পারবেন?
আর কত প্রাণ গেলে রাষ্ট্রের বিবেক জাগ্রত হবে? আর কত মায়ের বুক খালি হলে বুঝবে মানুষের জীবনের চেয়ে বড় কোনো রাজনৈতিক স্বার্থ হতে পারে না?
ক্ষমতা কার হাতে থাকবে, সেই প্রশ্নের চেয়ে অনেক বড় প্রশ্ন এই রাষ্ট্রে সাধারণ মানুষের জীবনের নিরাপত্তা কার হাতে? রাজনীতি হোক মানুষের জন্য, মানুষের বিরুদ্ধে নয়। রাষ্ট্র হোক নাগরিকের, কোনো ব্যক্তি বা দলের স্বার্থের নয়। এবার অন্তত মানুষ বাঁচুক, মানবিকতা জিতুক!