এস.এম.শামীম, খুলনা : একসময় পাড়া-মহল্লায় ছোটখাটো অপরাধ করত তারা। কেউ ছিল কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য, কেউ জড়িয়েছিল মাদক কেনাবেচায়। এর পর হাতে আসে অস্ত্র। শুরু হয় চাঁদাবাজি, দখল, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ আর আধিপত্য বিস্তারের লড়াই। বয়সের সীমাও খুব বেশি নয়, ১৬ থেকে ৩০।
এখন পাড়া-মহল্লাতে সীমাবদ্ধ নেই তাদের অপরাধের এলাকা, খুলনাজুড়ে তাদের দাপট। এক গ্রুপের সঙ্গে আরেক গ্রুপের বিরোধে প্রকাশ্যে গুলি, হামলা, এমনকি হত্যাকাণ্ডও ঘটছে। আর পেছনে থেকে অনেক ক্ষেত্রেই কলকাঠি নাড়ছে ‘গডফাদাররা’।
খুলনার অপরাধজগতের সাম্প্রতিক চিত্র বলছে, মহানগর ও জেলার বিভিন্ন অপরাধের ঘটনায় ঘুরেফিরে আসছে অন্তত ৯টি সন্ত্রাসী গ্রুপের নাম। জনবহুল এলাকায় প্রকাশ্যে হামলা, গুলি কিংবা হত্যাকাণ্ডেও দ্বিধা করছে না তাদের সদস্যরা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তালিকায় নাম আছে, অভিযানও হচ্ছে; কিন্তু গ্রেপ্তারের পর জামিনে বেরিয়ে ফের অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে সন্ত্রাসীরা। মূল হোতারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। ফলে এক দলকে দমন করতে না করতেই অন্য দল মাথাচাড়া দিচ্ছে। মাঠের অপরাধের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও চলছে শক্তির প্রদর্শন।
গত আট মাসে খুলনা মহানগর ও জেলায় অন্তত ৫৮টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এসব হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে আলোচিত ৯টি গ্রুপের কোনো না কোনো সদস্যের সম্পৃক্ততা রয়েছে। এ ছাড়াও সাম্প্রতিক অপরাধের বিভিন্ন ঘটনায় এসব গ্রুপের নাম ঘুরেফিরে আসছে বলে আইনশৃঙ্খলা-সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে। মাদক ও অস্ত্রের কারবার, স্থানীয় আধিপত্য, জমি, ঘের, ঘাট, পরিবহন ও ঠিকাদারি নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন গ্রুপের মধ্যে বিরোধও তৈরি হচ্ছে। কোথাও পুরোনো বিরোধের জেরে সংঘাত, কোথাও নতুন করে আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা—সব মিলিয়ে খুলনার অপরাধজগতের ভেতরে তৈরি হয়েছে একাধিক বলয়।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, আলোচিত গ্রুপগুলো হলো রনি চৌধুরী ওরফে গ্রেনেড বাবুর বি-কোম্পানি, শেখ পলাশের পলাশ গ্রুপ, হুমায়ুন কবীরের হুমা বাহিনী, আশিক বাহিনী, নূর আজিম গ্রুপ, টেংকি শাওন গ্রুপ, আরমান শেখের আরমান গ্রুপ, শাকিল শেখের শাকিল গ্রুপ ও নাসিমুল গণির নাসিম গ্রুপ। এর বাইরে দিঘলিয়া, আড়ংঘাটা, কয়রা, পাইকগাছা ও দাকোপ এলাকায় ছোট ছোট অস্ত্রধারী গ্রুপ সক্রিয় থাকার তথ্য রয়েছে। কোনোটি মাদক ও অস্ত্র কারবারকেন্দ্রিক, কোনোটি স্থানীয় আধিপত্য কিংবা জমি-ঘের দখলকে ঘিরে সক্রিয়। আবার কোথাও ঘাট, পরিবহন কিংবা ঠিকাদারি কাজ নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে তৈরি হচ্ছে নতুন বিরোধ। দৌলতপুর-মহেশ্বরপাশায় পুরোনো চরমপন্থি ধারার সন্ত্রাসের কিছু উত্তরাধিকারও টিকে আছে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।
গ্রেনেড বাবু ঘিরে পুরোনো নেটওয়ার্ক খুলনার সাম্প্রতিক অপরাধজগতে সবচেয়ে আলোচিত নাম রনি চৌধুরী ওরফে গ্রেনেড বাবু। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্রের দাবি, ২০০৪ সালে খুলনা সিটি করপোরেশনের তৎকালীন মেয়র শেখ তৈয়েবুর রহমানের গাড়িতে গ্রেনেড হামলার পর থেকেই তার নামের সঙ্গে ‘গ্রেনেড’ শব্দটি যুক্ত হয়।
বর্তমানে তার অনুসারীদের গ্রুপ ‘বি-কোম্পানি’ নামে পরিচিত। স্থানীয় একাধিক সূত্রের দাবি, মুম্বাইভিত্তিক অপরাধজগতের ‘ডি-কোম্পানি’র আদলে এ নামকরণ। গ্রুপটির নেতা নিজেকে ‘নবাব’ নামেও পরিচয় দেন বলে সূত্রের দাবি। তিনি দেশের বাইরে অবস্থান করে গ্রুপটি পরিচালনা করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক সূত্রের দাবি, সাম্প্রতিক খুন, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, দখল ও মাদক নিয়ন্ত্রণের বিভিন্ন ঘটনায় গ্রেনেড বাবুর অনুসারীদের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে। খুলনা মহানগরের বিভিন্ন থানায় তার নামে হত্যা, হত্যাচেষ্টা, মারধরসহ অন্তত ১৭টি মামলার তথ্য রয়েছে।
পলাশের উত্থানে বদলে যায় সমীকরণ গ্রেনেড বাবুর প্রভাবের মধ্যেই সামনে আসে শেখ পলাশের নাম। একসময় ছাত্রলীগের নেতা হিসেবে পরিচিত পলাশ ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর খুলনায় দ্রুত প্রভাব বিস্তার করেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। মিস্ত্রিপাড়া, বানরগাতি, আরামবাগ, নিরালা, পশ্চিম বানিয়াখামার, রূপসা, বাগমারা ও সোনাডাঙ্গায় তার প্রভাব বাড়তে থাকে।
এর পরই বাবু ও পলাশের অনুসারীদের মধ্যে আধিপত্যের লড়াই তীব্র হয়। একপক্ষের অনুসারীকে অন্যপক্ষের লোকজন হামলা কিংবা হত্যার ঘটনায় জড়ানোর অভিযোগ ওঠে। একপর্যায়ে বাবু কিছুটা কোণঠাসা হয়ে পড়েছিলেন বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।
২০২৫ সালের ৩০ মার্চ সোনাডাঙ্গায় চার ঘণ্টার অভিযানে অস্ত্রসহ ১০ সহযোগীকে নিয়ে শেখ পলাশকে গ্রেপ্তার করে যৌথ বাহিনী। ওই সময় তার দলের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গোলাগুলির ঘটনাও ঘটে। পলাশ গ্রেপ্তার হওয়ার পর অপরাধজগতের নিয়ন্ত্রণে আবার নতুন সমীকরণ তৈরি হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি।
দুপক্ষের বিরোধের রেশ কারাগারেও পৌঁছে। গত বছরের ১৭ অক্টোবর কারাগারে দুই গ্রুপের সদস্যদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
জোট বদলায়, নেটওয়ার্ক থাকে খুলনার অপরাধজগতের বিষয়ে খোঁজখবর রাখেন এমন একাধিক সূত্রের দাবি, সময়ের সঙ্গে গ্রুপগুলোর মেরূকরণও বদলাচ্ছে। হুমা গ্রুপের সঙ্গে বি-কোম্পানির ঘনিষ্ঠতা এবং পলাশের সঙ্গে আশিক বাহিনীর সদস্যদের যুক্ত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।
সম্প্রতি তিনটি ঠিকাদারি কাজে বাধা দেওয়াসহ কয়েকটি ঘটনায় দুপক্ষের সম্মিলিত তৎপরতার অভিযোগ উঠেছে। টুটপাড়া, মহিরবাড়ি ও তালতলা এলাকায় নূর আজিম গ্রুপ এবং চানমারী, শিপইয়ার্ড রোড ও সাচিবুনিয়া এলাকায় আশিক বাহিনীর তৎপরতার কথা বলছে আইনশৃঙ্খলা-সংশ্লিষ্ট সূত্র।
লবণচরা-জিন্নাহপাড়া এলাকায় শাকিল গ্রুপ এবং দৌলতপুর, মহেশ্বরপাশা, দেয়ানা ও তেলিগাতী এলাকায় হুমা, আরমান ও নাসিমুল গণির নাম বেশি আলোচিত।
ফেসবুকেও ক্ষমতার মহড়া অপরাধী গ্রুপগুলোর তৎপরতা এখন আর শুধু মাঠে নেই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকেও নিজেদের শক্তি প্রদর্শনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে তারা। বিভিন্ন পেজ ও আইডিতে দলবদ্ধ অবস্থানের ছবি, হুমকির বার্তা, নির্যাতনের ভিডিও ও নানা ধরনের ঘোষণা প্রচার করা হচ্ছে।
একটি ফেসবুক পেজে নিজেদের বি-কোম্পানি হিসেবে পরিচয় দেওয়া একটি গ